বৈরুতের কেন্দ্রস্থলের ওয়াটারফ্রন্টে আলা নামের এক ব্যক্তি মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন। অধিকৃত গোলান মালভূমি থেকে আসা এই সিরীয় শরণার্থী এখন গৃহহীন। তিনি জানালেন, লেবাননের রাজধানীতে আশ্রয়ের খোঁজে তিনি সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছেন। আগে তিনি বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি দাহিয়েহ-তে থাকতেন, যা এখন ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধে লেবাননজুড়ে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। খবর আলজাজিরার।
আলা এখন শুধু নিরাপদ একটি জায়গা খুঁজছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার (২০ মার্চ) থেকে শুরু হওয়া মুসলিমদের উৎসব ঈদুল ফিতর তাঁর ভাবনায় নেই বললেই চলে। ঈদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি ‘না’ সূচক উত্তর দেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য এখন একটি তাঁবু জোগাড় করা।
আলা বলেন, ‘একটি স্কুলে থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু তারা মানা করে দিয়েছে। এরপর সমুদ্রতীরে গিয়ে শুয়েছিলাম। পরে পৌরসভার লোকজন আমাকে এখানে ওয়াটারফ্রন্টে আসতে বলল।’ আলা কোনো তাঁবু পাননি, আপাতত খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাচ্ছেন। তবে অন্যরা তাঁবু টানাতে পেরেছেন, যার ফলে দামী রেস্তোরাঁ ও বারের জন্য পরিচিত এই এলাকাটি এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু-শহরে পরিণত হয়েছে। লেবাননজুড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। লেবানিজরা জানেন না এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলের সাথে চলা সংঘাতের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এই নতুন বিপর্যয় তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ইরানের পরিস্থিতি
ইরানে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই, তার ওপর যুদ্ধের আগের অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মানুষ ঈদের কেনাকাটা করার সামর্থ্য হারিয়েছে। এমনকি তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের মতো জায়গায় কেনাকাটা করতে যাওয়াও এখন বিপজ্জনক, কারণ বোমা হামলায় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারবিরোধীদের কাছে ঈদের ধর্মীয় বিষয়টি বাড়তি সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে; তাদের কেউ কেউ এখন যেকোনো ধর্মীয় আচারকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থন হিসেবে দেখছেন। এ বছর নওরোজ (পারস্য নববর্ষ) এবং ঈদ একই দিনে (শুক্রবার) হওয়ায় সরকারবিরোধী শিবিরের অনেকে কেবল নওরোজ উদযাপনেই মনোনিবেশ করছেন এবং ঈদের অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলছেন।
গাজায় বেঁচে থাকার লড়াই
গাজার অনেক ফিলিস্তিনি ঈদ উদযাপন করতে চাইলেও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট তা অসম্ভব করে তুলেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় পণ্য প্রবেশের ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধ আরও বেড়েছে, যা শিশুদের খেলনাসহ সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
গাজা শহরের আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে বসবাসকারী ৬২ বছর বয়সী খালেদ সেন্ট্রাল রিমাল বাজারে গিয়েছিলেন সবজি ও ফলের দাম দেখতে। ভিড় দেখে তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে ঈদের পরিবেশ প্রাণবন্ত মনে হলেও আর্থিকভাবে অবস্থা খুবই খারাপ। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে এখন তাঁবু বা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছে। যুদ্ধে সবাই সবকিছু হারিয়েছে।’
খালেদ জানান, ফল বা সবজি কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই। তাঁর মতে, এগুলো এখন কেবল ‘রাজাদের’ জন্য, তাঁর মতো ‘নিঃস্ব ও ক্লান্ত’ মানুষের জন্য নয়। যুদ্ধের আগে তাঁর নিজের একটি সুপারমার্কেট ছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে ঈদে মেয়ে আর বোনদের বাড়িতে যাওয়ার সময় তিন হাজার শেকলের বেশি উপহার দিতাম। ঘর সাজানো, বাচ্চাদের নতুন পোশাক, মিষ্টি-চকলেট—সবই থাকত। এবার যুদ্ধবিরতি হলেও তার কিছুই সম্ভব নয়।’
তিন সন্তানের মা শিরীন শরীমও একই কথা বলেন। বাজারে ঘুরতে ঘুরতে তিনি বলেন, ‘আমাদের ঈদের আনন্দ অপূর্ণ। দুই বছরের চরম কষ্টের যুদ্ধ থেকে বের হতে না হতেই এমন জীবনে পড়েছি যেখানে মৌলিক চাহিদাগুলোও অপূর্ণ।’ ইসরায়েল হামলা থামানোর কোনো লক্ষণ না দেখানোয় শিরীন জানেন না কবে গাজা পুনর্গঠিত হবে।
সংহতির শক্তি
বৈরুতে রাজনৈতিক গবেষক করিম সাফিউদ্দিন অবশ্য কিছুটা ধৈর্যশীল। কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি বড় পরিবারের সাথে ঈদ পালন করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাস্তুচ্যুত হয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি এই পারিবারিক বন্ধন মজবুত করা এবং সাম্প্রদায়িক সংহতি বজায় রাখাই এই যুদ্ধে টিকে থাকার প্রধান শর্ত।’
করিম আরও যোগ করেন, ‘সংহতি ছাড়া আমরা সমাজ বা দেশ গড়তে পারব না। বোমার নিচে থাকা একটি দেশের জন্য এটিই হবে মানুষের সামনের দিকে তাকানোর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।’