ভোরের আলোর মুখ দেখে নতুন এক স্বপ্নের খোঁজে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয় হাজারো ফুটফুটে শিশু। কিন্তু সেই প্রাণোচ্ছ্বল হেঁটে যাওয়া যদি শেষ হয় পিচঢালা কালো পিচের ওপর নিথর নিস্পন্দ হয়ে! যে পথ দিয়ে পৌঁছানোর কথা ছিল পাঠশালা কিংবা খেলার মাঠে, সেই পথই যেন এক অলক্ষ্য ফাঁদ পেতে কেড়ে নেয় কোমল মতি শিশুদের সম্ভাবনা। স্বজনদের বুকফাটা হাহাকারে ভারি হয়ে উঠে আকাশ-বাতাস।
আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এ উপলক্ষে যখন দেশজুড়ে সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের সড়কগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার এমনই বাস্তবতার চিত্র উঠে আসে।
গতকাল বুধবার (২১ অক্টোবর) সড়ক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের’ প্রকাশিত বিশেষ ডাটা ও মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৭ হাজার ৯৬৩ জন শিশু।
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ঘটছে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে। মোট শিশুমৃত্যুর ৪৪ শতাংশ ঘটেছে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে। এসব সড়কে গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি না থাকাকে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার প্রায় ৩৩ শতাংশ ঘটেছে মহাসড়কে, যেখানে তীব্র গতিতে চলা ভারি যানবাহনের ধাক্কায় পথচারী শিশুরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া বাকি ২৩ শতাংশ শিশু প্রাণ হারিয়েছে জেলা শহর ও মেট্রোপলিটন এলাকার সড়কগুলোতে।
যানবাহনভিত্তিক বিস্তারিত পরিসংখ্যান
কোন ধরনের যানবাহনে বা কিসের ধাক্কায় শিশুর মৃত্যু বেশি ঘটছে, তার বিশদ তথ্য তুলে ধরেছে সংস্থাটি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নিহত শিশুদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী। কিশোর বয়সে হেলমেট ছাড়া বেপরোয়া গতিতে বাইক চালানো এবং অভিভাবকদের অসচেতনতাই এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি পথচারী শিশুদের ওপর গাড়ি তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল বেপরোয়া ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ড্রাম ট্রাক; এই ধরনের বাহনে প্রাণ গেছে ২৯ শতাংশ শিশুর। এ ছাড়া লোকাল বাস এবং অননুমোদিত থ্রি-হুইলার যেমন নসিমন, করিমন ও সিএনজি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে বাকি ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু।
ঝুঁকিতে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে দেখা যায়, মৃত ৭ হাজার ৯৬৩ জন শিশুর মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫১৩ জন শিশুই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে। রাস্তা পারাপারের সময় কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না থাকা এবং স্কুলের সামনে ‘স্পিড ব্রেকার’ বা পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিং না থাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ঘটছে।
বয়সভিত্তিক ঝুঁকির চিত্র
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যাদের বড় একটি অংশই ছিল মোটরসাইকেল সংক্রান্ত দুর্ঘটনার শিকার। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৫৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যাদের অধিকাংশ রাস্তা পারাপারের সময় পথচারী হিসেবে গাড়ির ধাক্কা খেয়েছে। এ ছাড়া অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৫৮ জন শিশু অভিভাবকের অসাবধানতা ও গ্রামীণ সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার কারণে প্রাণ হারিয়েছে।
সুপারিশ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ককে শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে হলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ ও জেব্রা ক্রসিং তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়কে বেপরোয়া থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।