সাভারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থী শারমিন জাহান খাদিজার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আজ সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে তার মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া থানার তেতৈয়া মোল্লা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা। বেলা পৌনে ২টার দিকে শারমিনের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে বেদানাবিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শারমিন জাহান খাদিজা চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার তেতৈয়া গ্রামের শাহজাহান মোল্লার মেয়ে। তার দুই মেয়ের মধ্যে খাদিজা ছিলেন ছোট এবং সবচেয়ে আদরের। এদিকে এ ঘটনায় নিজেদের হেজাফতে নেওয়া শারমিনের স্বামী ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিম আল হাসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পাঁচদিনের রিমান্ড চেয়ে ঢাকা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. শহিদুজ্জামান বলেন, পুলিশ হেফাজতে নেওয়া শারমিনের স্বামীকে হত্যা মামলায় সুনির্দিষ্ট আসামি করায় তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ফাহিম ও শারমিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। আমরা আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করছি। এ ছাড়াও উভয়ের কল ডিটেইল সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো ওফ ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি টিম ক্রাইমসিন সংগ্রহ করেছে। আশা করি শিগ্গির এ ঘটনার জট খুলবে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম,অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম বলেন, রোববার রাতের বিভিন্ন সময়ে ফাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু সে বরাবরই নিজের জড়িত থাকার কথা এড়িয়ে গেছে। নিবিড় তদন্ত চলছে রিমান্ডে আসার পর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ খুনের মোটিভ মিলবে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনার রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সহ সভাপতি আব্দুর রশিদ জিতু ও সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম।
এর আগে এ ঘটনায় নিহত শারমিনের চাচা মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামি ফাহিম আল হাসান (২২) কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার খুরুইল গ্রামের বাসিন্দা।
মামলার বাদী রাজধানীর থানা-উত্তরা পশ্চিম মডেল থানার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম (৪৬) এজাহারে অভিযোগ করে বলেন, শারমিন জাহান খাদিজার সঙ্গে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম আল হাসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তারা চলতি বছরের ২৪ জুন ইসলামিক শরিয়ত মেনে নিজেরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর আমাদের পরিবারকে বিষয়টি অবগত করে এবং সেপ্টেম্বর মাস থেকে আশুলিয়া থানার ইসলামনগর জামে মসজিদ সংলগ্ন জনৈক সুপ্তদের বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়া বসবাস করে আসছিল। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই উভয়ের দাম্পত্য জীবনে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া কলহ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি শারমিন তার বাবা ও মাকে অবহিত করেছিল বলেও উল্লেখ করা হয় এজাহারে।
গত রোববার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ফাহিম তাকে মোবাইলে ফোন করে জানায়, আপনার ভাতিজি গুরুতর অসুস্থ আপনি দ্রুত বাসায় আসেন। সংবাদ পেয়ে আমি আশুলিয়া দ্রুত ওই বাসায় ছুটে যাই।
চতুর্থ তলা বাড়িটির নিচ তলার বাম পাশের রুমে ঢুকে শারমিনকে খাটের ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। তখন আমি আশপাশের লোকজনের সহায়তায় আমার ভাতিজিকে চিকিৎসার জন্য এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শারমিনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মর্গে মরদেহ প্রেরণের আগে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়। শারমিনের কপালের ডান পাশে, মাথার ওপরে গভীর কাটা রক্তাক্ত জখম দেখা যায়। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে জানতে পারি, আসামি ফাহিমন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে বিকেল অনুমান সাড়ে ৩টায় ভাড়া বাসায় ফিরে যান। এই সময়ের মধ্যেই ফাহিমসহ অজ্ঞাতনামারা পরস্পরের যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে শারমিনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা, কপালসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে হত্যা করে।
প্রসঙ্গত গত রোববার বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলাম নগর গ্রামের একটি ভাড়া বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন লোক প্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের (৫১তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী শারমিন জাহান খাদিজা।