তীব্র প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় পাঁচ লাখ অধিবাসীর মাসিক খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে দিচ্ছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। তহবিল সংকটের কারণে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) জানিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
এই কাটছাঁটের ফলে গাজার প্রায় অর্ধেক নাগরিক (১১ লাখ) জাতিসংঘের এই সংস্থাটির কাছ থেকে প্রতি মাসে খাদ্য বা নগদ সহায়তা পেলেও তা পাবে আগের চেয়ে কম পরিমাণে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে যে, গত বছর গাজায় দেখা দেওয়া দুর্ভিক্ষের প্রভাব প্রশমিত করতে তাদের প্রচেষ্টা ভূমিকা রেখেছিল—যদিও পরিস্থিতির সেই মূল্যায়ন নিয়ে ইসরায়েল আপত্তি জানিয়েছিল। একই সাথে সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, পরিস্থিতি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে তারা সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারে।
পূর্ব জেরুজালেমে ডব্লিউএফপি-র কার্যালয়ে এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি শন হিউজ বলেন, ‘এটি গাজাবাসীর জন্য একটি জীবন রক্ষাকারী অবলম্বন হিসেবে কাজ করছিল। কিন্তু এখন সেই সহায়তার ধারা বজায় রাখা ও বাড়াতে পারার পরিবর্তে আমাদের আসলে তা কমাতে হচ্ছে। আর এর কারণ এটা নয় যে খাদ্য পৌঁছানোর জন্য আমাদের কাছে মানবিক প্রবেশাধিকার নেই; বরং এর একমাত্র কারণ আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল নেই।’
শন হিউজ জানান, সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজার ১৪ লাখ মানুষ—বা মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ—এখনও ভীষণভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং টিকে থাকার জন্য তাদের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
‘অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি’
গাজার বাসিন্দারা সহায়তার এই কাটছাঁটের খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই পুরো জনগোষ্ঠীই অন্তত একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের ৪৫ বছর বয়সী সামাহের আল-নাজ্জার বলেন, ‘একজন মায়ের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের সন্তানদের ক্ষুধার্ত দেখা এবং তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে না পারা। আমরা তাঁবুতে থাকি এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার মতো টাকা আমাদের নেই। আমরা আমাদের খাবারের একটি অংশের জন্য এই ত্রাণের ওপরই নির্ভর করে থাকি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেবল চাই আমাদের সন্তানরা যেন প্রতিদিন অন্তত কিছু খেতে পায়। এই সহায়তা বন্ধের পরিণতি হবে অত্যন্ত কঠিন।’
গাজা সিটির ৪০ বছর বয়সী আয়মান দাগমাশ সহায়তা বন্ধের এই খবরকে আতঙ্কজনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই সহায়তা আমাদের কিছুদিন অন্তত বেঁচে থাকতে সাহায্য করত। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি না কীভাবে পরিবারের চাহিদা মেটাব—বিশেষ করে কিছু দিন আগে গাজার গণরান্নাঘরগুলো (কমিউনিটি কিচেন) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।’
আয়মান দাগমাশ আরও বলেন, ‘কাজের কোনো সুযোগ নেই, স্থায়ী কোনো আয়ও নেই, আর বাজারে খাবারের দাম আমাদের সামর্থ্যের বাইরে। সব দিক থেকে সহায়তা আসা বন্ধ হয়ে গেলে আমরা কীভাবে বাচ্চাদের খাওয়াব?’
এক বছর আগে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ডব্লিউএফপি গাজায় তুলনামূলক বেশি সহায়তা পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও এরপর থেকে ইসরায়েল গাজায় ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত সবাইকে হত্যার প্রতিজ্ঞা বজায় রেখেছে।
তবে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রতি মাসে ১৫ লাখ থেকে ১৮ লাখ মানুষ এই সহায়তা পেয়ে আসছিলেন।
ত্রাণগ্রহীতার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি ডব্লিউএফপি খাদ্য সামগ্রীর পরিমাণও কমিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে।
এক বিজ্ঞপ্তিতে ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, খাদ্য সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলো এখন দুটি প্যাকেটের বদলে মাত্র একটি প্যাকেট পাবে এবং গমের আটার ব্যাগটির আকারও ছোট করে দেওয়া হবে।
এছাড়া, যে ৭৫ হাজার পরিবার নগদ অর্থ সহায়তা পেত, তাদের মাসিক সহায়তার পরিমাণ ১,২৫০ শেকেল থেকে কমিয়ে ৭৫০ শেকেল (৪০০ ডলার থেকে কমে ২৪০ ডলার) করা হবে।
ডব্লিউএফপি মূলত বিভিন্ন দেশের সরকার এবং ব্যক্তিগত দাতাদের তহবিলে পরিচালিত হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও দ্বিপাক্ষিক সহায়তার পরিমাণ ব্যাপকভাবে ছাঁটাই করায় সংস্থাটির তৎপরতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে যে, গাজা ও পশ্চিম তীরে আগামী ছয় মাসের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের প্রায় ৪৫ কোটি ডলার প্রয়োজন, কিন্তু ২০২৬ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জন্য তারা স্বাভাবিক অর্থায়নের মাত্র অর্ধেক তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছে।
গত সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলি দখলাদারিত্বে থাকা পশ্চিম তীরে ত্রাণগ্রহীতার সংখ্যা চার লাখ থেকে কমিয়ে অর্ধেকে, অর্থাৎ দুই লাখে নামিয়ে আনে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী ইসরায়েল গাজায় কিছু পণ্য প্রবেশের অনুমতি দিলেও সামরিক কাজে ব্যবহার হতে পারে এমন যেকোনো সামগ্রীর চালান এখনও আটকে দিচ্ছে—জাতিসংঘের মতে, এই নীতির কারণে এমনকি কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চালানেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল জাতিসংঘের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের সমালোচনা আরও জোরদার করেছে এবং বৈশ্বিক এই সংস্থাটিকে পক্ষপাতিত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের নির্ভরশীল করে রাখার জন্য অভিযুক্ত করে আসছে।