সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী পারভিন আক্তার তার স্বামীর তিন সৎ ভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, অসুস্থ নাছির উদ্দিন চৌধুরীর গলায় রামদা ধরে ভয় দেখিয়ে বাড়িসহ সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রি করানো হয়েছে।
দিরাই উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকসহ নাছির উদ্দিন চৌধুরীর তিন সৎ ভাইকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- দিরাই উপজেলার মাতারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম, পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ছয়ফুল চৌধুরী, তল বাউসী গ্রামের দলিল লেখক মুজিবুর রহমান, কলিয়ারকাপন গ্রামের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম ও দিরাইয়ের বাসিন্দা মোহরা মমতাজ বেগম।
গতকাল সোমবার (১০ আগস্ট) দিরাই আমলি আদালতে মামলাটি করা হয়। পরে এটি সিআর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
মামলার এজাহার/আবেদনে পারভিন আক্তার উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি নাছির উদ্দিন চৌধুরীর দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে মারধর ও শ্লীলতাহানির শিকার হন। তার অভিযোগ, নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িসহ সম্পত্তি থেকে তার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের বঞ্চিত করে সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে আসামিরা অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে আসছিলেন।
মামলায় বলা হয়, ওই সময় নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী শেলী চৌধুরী অসুস্থ হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। একই সময়ে নাছির উদ্দিন চৌধুরীও দিরাইয়ের বাড়িতে অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন। এ সুযোগে নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দাতা সাজিয়ে আসামিরা গ্রহীতা হয়ে বাড়িসহ অন্যান্য ভূমির দলিল করার পরিকল্পনা করেন। এর মাধ্যমে বাদীর দুই মেয়ে, অন্য স্ত্রী এবং নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বোনকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি দিরাই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুই কর্মচারীকে অফিসার সাজিয়ে অসুস্থ ও অক্ষম নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দলিলে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি এতে অসম্মতি জানালে তার গলায় রামদা ধরে স্বাক্ষর না করলে গলা কেটে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় কথাবার্তা শুনে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অপর স্ত্রী শেলী চৌধুরী সেখানে এসে বাধা দিলে আসামি মিজানুর রহমান চৌধুরী তাকেও হত্যার হুমকি দেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে শেলী চৌধুরী মেঝেতে ঢলে পড়েন।
মামলায় আরও বলা হয়, নাছির উদ্দিন চৌধুরীর টঙ্গর এলাকার সমর্থক ওয়াকিব হাসান তখন তাকে দেখতে ওই বাড়িতে আসেন এবং ঘটনাটি দেখতে পান। পরে মঈন উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যরা ভয়ভীতি দেখিয়ে ওয়াকিব হাসানকে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পারভিন আক্তার মামলায় আরও উল্লেখ করেন, নাছির উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আসামিরা নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে আসামিরা তাকেও শারীরিকভাবে আক্রমণ ও শ্লীলতাহানি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলায় বলা হয়েছে, পরে নাছির উদ্দিন চৌধুরী কিছুটা সুস্থ হয়ে এসব বিষয় জানতে পেরে আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেন। এ ছাড়া বাড়িতে থাকা ২০ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল আসামিরা আটকে রেখেছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পারভিন আক্তার আরও অভিযোগ করেন, আসামিদের এমন কর্মকাণ্ডের কথা জানাজানি হলে এলাকায় জনরোষ তৈরি হয়। পরে আসামিরা ক্ষমা প্রার্থনা করে দলিল বাতিল করার অঙ্গীকার করেন। এ কারণে নাছির উদ্দিন চৌধুরী তাদের বিরুদ্ধে তখন কোনো ব্যবস্থা নেননি। এ কারণেই আদালতের আশ্রয় নিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করেছেন তিনি।
পারভিন আক্তার বলেন, আমরা জোর করে কিছু করতে চাই না। আইনও হাতে তুলতে চাই না। এজন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।
মামলাটি আমলে নিয়ে দিরাই আমলি আদালতের বিচারক মো. জসিম তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের পেশকার মোহিত লাল চন্দ মিঠু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার পারভিন আক্তারের পক্ষে মামলাটি দায়ের করেন আইনজীবী কাওছার আলম।
অভিযোগের বিষয়ে মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, দলিল রেজিস্ট্রি করেন সাব-রেজিস্ট্রার। আমার বোন এবং নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রকৃত স্ত্রী বিষয়টি জানতেন। মামলা কী হয়েছে, জানি না। জানার পর আইনিভাবেই জবাব দেব।