প্রতিদিনের মতো ডিউটির পোশাকেই ছিলেন তিনি। খবর এলো—শহরের এক জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনায় চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে ১০ বছরের এক নিষ্পাপ শিশু। আর দশটা দিনের মতোই আইনশৃঙ্খলা সামলাতে ও সড়ক থেকে মরদেহটি উদ্ধার করতে তড়িঘড়ি করে ঘটনাস্থলে ছোটেন পুলিশ সদস্য বাবা। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে রক্তে ভেসে থাকা বাইসাইকেল আর নিথর রক্তঝরা দেহটির মুখোমুখি হতেই থমকে গেল চারপাশ, স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো পৃথিবী। সহকর্মীদের সামনেই চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়লেন সেই পুলিশ কনস্টেবল। কারণ, চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়া সেই অবোধ শিশুটি অন্য কেউ নয়—তারই বুকের মানিক, ১০ বছরের আদুরে সন্তান তুহিন!
আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল সোয়া ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল জনতা স্কুল রোড এলাকায় ঘটে যায় এই বুকফাটা নির্মম ঘটনা। কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মোহাম্মদ সামছুল ইসলাম দায়িত্বের তাগিদে মরদেহ উদ্ধার করতে গিয়ে মুখোমুখি হন নিজ সন্তানের নিথর দেহের।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা সদর উপজেলার বাসিন্দা কনস্টেবল সামছুল ইসলাম পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। আজ সকালে তার ছেলে, আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তুহিন (১০) নিজের সাইকেলটি নিয়ে বাসা থেকে ঘুরতে বের হয়। জনতা স্কুল রোড এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে আসা একটি সিমেন্টবোঝাই দ্রুতগামী ট্রাক তাকে বেপরোয়াভাবে চাপা দেয়। স্থানীয়রা আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ছোট্ট তুহিনের প্রাণপাখি উড়ে যায়।
খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান কনস্টেবল সামছুল ইসলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজের ১০ বছরের কলিজার টুকরাকে রক্তভেজা রাস্তায় এভাবে পড়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সন্তানের মরদেহ জড়িয়ে ধরে তার সেই বুকফাটা আর্তনাদে দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত সহকর্মী পুলিশ সদস্য ও সাধারণ পথচারীদের চোখেও জল চলে আসে। পুরো এলাকায় নেমে আসে এক গভীর ও থমথমে শোকের ছায়া।
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা আবেগআপ্লুত কণ্ঠে জানান, সামছুল ইসলাম তাদের থানার অত্যন্ত দায়িত্বশীল একজন সদস্য। দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ামাত্রই পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন নিহত শিশুটি তার নিজেরই ছেলে। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্য অত্যন্ত বেদনার। ঘাতক ট্রাকটিকে জব্দ করা হলেও চালক পালিয়ে গেছে, তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পাকুন্দিয়ায় বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে চালক নিহত, আহত ৬
এদিকে একই দিন সকাল ১১টার দিকে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় অন্য এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাইক্রোবাসচালক নিহত হয়েছেন। ঢাকা-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাকুন্দিয়া উপজেলার চিলাকাড়া মৌলভীবাড়ি সংলগ্ন এলাকায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ‘অনন্যা ক্লাসিক’ পরিবহণের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে নিকলী হাওরগামী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের তীব্রতায় দুটি যানবাহনই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গভীর খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান মাইক্রোবাসচালক এ কে মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ঢাকার মিরপুরের কাফরুল এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় আরও ৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আহতদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।