ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ পর্যন্ত এ যুদ্ধে ওয়াশিংটনের খরচ হয়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে (৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার)। যা গত মে মাসের আনুমানিক হিসেব থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেশি। খবর বিবিসির।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২১ জুলাই) মার্কিন সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির শুনানিতে উপস্থিত হয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আরও ৮৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছেন। এই ৮৭ বিলিয়নের মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন ডলারই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক অভিযানের জন্য বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউস আগামী অর্থবছরের জন্য পেন্টাগনের ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাজেটের অনুরোধ করেছিল, যা আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ক্যাপিটল হিলে শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সতর্ক করে বলেন, আমরা বিপজ্জনক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয় অর্থ অনুমোদন না করা হলে আমরা মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়ব, যা আমাদের সেনাসদস্যদের স্বাভাবিক বেতন দেওয়া, দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ পুনঃসরবরাহ করা এবং কোনো বিঘ্ন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রম বজায় রাখার সক্ষমতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে।
হেগসেথ দাবি করেন, বরাদ্দকৃত প্রতিটি ডলার মার্কিন বাহিনীর ‘সক্ষমতা’ বাড়াতে এবং ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হবে।
কমিটির চেয়ারপারসন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বাজেট না পাওয়ার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললে হেগসেথ জানান, এর ফলে সেনাসদস্যদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ কাটছাঁট করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সামরিক খাতে অপর্যাপ্ত তহবিল রাখার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনকে দায়ী করেন।
তবে কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য প্যাটি মুরে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, এ ধরনের বাজেটের আবেদন কোনো যৌক্তিক ভিত্তি বহন করে না। সিনেটর ডিক ডারবিন যুদ্ধের মোট ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে হেগসেথ ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কথা জানান।
তবে সিবিএস নিউজকে দুটি ডেমোক্রেটিক সূত্র এবং ঘটনার সঙ্গে পরিচিত তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি। কারণ এই হিসাবের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর পুনর্নির্মাণ খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মে মাসের ১২ তারিখে জ্যেষ্ঠ পেন্টাগন কর্মকর্তা খরচ ২৯ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ব্যয় ছিল ১১.৩ বিলিয়ন ডলার।
শুনানি শুরুর পরই যুদ্ধবিরোধীরা একাধিকবার ব্যাঘাত ঘটায়। পরবর্তীতে সিনেটরদের প্রশ্নের মুখে হেগসেথের সঙ্গে তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। ডেমোক্রেটিক সিনেটর কিয়ার্স্টেন জিলিব্র্যান্ড অভিযোগ করে বলেন, যখন দেশের সাধারণ নাগরিকরা পরিবারকে খাওয়াতে পারছে না, তখন ট্রাম্প প্রশাসন বোমাবর্ষণের জন্য ‘অসীম অর্থ’ চাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেখানে দাবি করছেন যুদ্ধ আগেই জেতা হয়ে গেছে, সেখানে আবার হাজার কোটি ডলার কেন চাওয়া হচ্ছে- তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
অন্য ডেমোক্রেটিক সিনেটর গ্যালি পিটার্স প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই প্রশাসন আরেকটি ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ তৈরি করছে। জবাবে ক্ষিপ্ত হেগসেথ বলেন, ‘আপনার লজ্জা হওয়া উচিত’। একই সঙ্গে পিটার্স ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিন্ড্রোমে’ ভুগছেন বলে তোপ দাগেন।
ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকানদের অনেক কঠোর রাজস্বপন্থীরাও অন্য খাতের বাজেট না কমিয়ে নতুন এই অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করছেন।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) থেকে ছুটিতে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের আগে দুই কক্ষের যৌথ অধিবেশন বসবে না। ফলে রিপাবলিকানরা ভোট নিশ্চিত করতে পারলেও পেন্টাগনের হাতে এই নতুন অর্থ পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা ভেঙে গিয়ে গত সপ্তাহে ফের সংঘাত শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র টানা ১২ দিন হামলা চালিয়েছে। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দীর্ঘ মার্কিন যুদ্ধগুলোর তালিকা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
পেন্টাগন সম্প্রতি ইরাকে ৩০ বছর বয়সী সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টন ও জর্ডানে ২৮ বছর বয়সী সার্জেন্ট অ্যাঞ্জেল রামপারসাদের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে। এর এক দিন আগে জর্ডানে প্রাণ হারান ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গঞ্জালেস ও ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেনেন্ট টাইলার ফিহান।
বুধবার (২২ জুলাই) সকালে ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের বিমানঘাঁটিতে পতাকাবৃত কফিনে চার সেনার লাশ দেশে পৌঁছালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সশরীরে উপস্থিত থেকে তাদের শ্রদ্ধা জানান।