বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রিয়, আবার সবচেয়ে অপছন্দের দলও কেন আর্জেন্টিনা?

বিশ্বকাপ এলেই একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। কেউ আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি গায়ে চাপায়, আবার কেউ শুধু হারতে দেখার জন্য প্রতিপক্ষের সমর্থক হয়ে যায়। আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, সুইজারল্যান্ড কিংবা ইংল্যান্ড-যেই হোক, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেললেই যেন নতুন সমর্থক জুটে যায় তাদের!

আজ রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনালেও সেই চিত্র বদলাচ্ছে না। স্পেনের লাল জার্সির পেছনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছেন বিশ্বের বহু ফুটবলপ্রেমী। প্রশ্ন হচ্ছে-বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা কেন এতটা বিভক্ত করে ফুটবল বিশ্বকে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাস, কিংবদন্তি, রাজনীতি, আবেগ এবং ফুটবল সংস্কৃতির জটিল এক মিশেলে!

আর্জেন্টিনার ফুটবল পরিচয়ের কেন্দ্রে আছেন দুই মহাতারকা-ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং শতাব্দীর সেরা গোল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, তৈরি করেছিল জাতীয় প্রতিরোধের এক প্রতীক। ফকল্যান্ড যুদ্ধের চার বছর পর সেই জয়কে অনেক আর্জেন্টাইন দেখেছিলেন প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে।

সেই ইতিহাস আজও বিতর্ক উসকে দেয়। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা (ফকল্যান্ড/মালভিনাস আর্জেন্টিনার) লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেন, যা রাজনৈতিক বার্তা নিষিদ্ধ করার ফিফার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আলোচনা তৈরি করেছে।

ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার নতুন প্রতীক হয়ে ওঠেন লিওনেল মেসি। মাঠের বাইরে শান্ত স্বভাবের হলেও, বার্সেলোনায় দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে যুগান্তকারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাকে বৈশ্বিক ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের নানা দেশে মেসির কোটি কোটি ভক্ত রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকে মনে করেন, ফুটবলকে ঘিরে অতিরিক্ত ‘মেসি-কেন্দ্রিক’ আলোচনাও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মেসির জনপ্রিয়তা যেমন আর্জেন্টিনার সমর্থক বাড়িয়েছে, তেমনি বিরোধী শিবিরও তৈরি করেছে।

লাতিন আমেরিকাতেও আর্জেন্টিনার ভাবমূর্তি সবসময় সহজ নয়। দেশটি নিজেদের ফুটবল ঐতিহ্য ও সাফল্য নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু প্রতিবেশী অনেক দেশের কাছে সেই আত্মবিশ্বাস কখনও কখনও অহংকার হিসেবেও ধরা পড়ে।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আবেগ, ঢাক-ঢোল, গান ও উদযাপন ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণ। তবে কিছু ঘটনা সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি এক আর্জেন্টাইন টেলিভিশন বিশ্লেষকের মেক্সিকোকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করে। অতীতে ফ্রান্সের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের নিয়ে বর্ণবাদী গান গাওয়ার ঘটনায় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের প্রকাশ্যে ক্ষমাও চাইতে হয়েছিল।

আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তালিকাও দীর্ঘ। ব্রাজিলের সঙ্গে ঐতিহাসিক দ্বৈরথ তো আছেই। চিলির কাছে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনাল হার, মেক্সিকোর সঙ্গে বিশ্বকাপের লড়াই এবং ইংল্যান্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ফুটবলীয় ইতিহাস-সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা যেন প্রতিটি টুর্নামেন্টেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

মাঠের খেলাতেও আলবিসেলেস্তেদের নিয়ে বিতর্ক কম নয়। তাদের কারিগরি দক্ষতা যেমন প্রশংসিত, তেমনি সময় নষ্ট, কৌশলী ফাউল কিংবা মানসিক চাপ তৈরির মতো কৌশল অনেক প্রতিপক্ষের চোখে ‘ডার্ক আর্টস’ হিসেবেও পরিচিত।

তবু এসবের মাঝেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই-আর্জেন্টিনা কখনও নিরপেক্ষ অনুভূতির দল নয়। কেউ তাদের ভালোবাসে, কেউ অপছন্দ করে; কিন্তু তাদের উপেক্ষা করা যায় না।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *