৩৫ ম্যাচ অপরাজিত, তবু স্পেনের চোখ শুধু ৯০ মিনিটে!

বিশ্বকাপ যত শেষের দিকে এগোচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে সমীকরণ। গ্রুপ পর্ব কিংবা শেষ ষোলোর সাফল্য এখন আর খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। কারণ নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই হয় বেঁচে থাকার লড়াই। ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্পেন। টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস, চলতি বিশ্বকাপে এখনো গোল না খাওয়ার কৃতিত্ব এবং ছন্দে থাকা স্কোয়াড-সবই তাদের পক্ষে কথা বলছে। কিন্তু আজ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে স্প্যানিশ শিবিরে রেকর্ডের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বাস্তবতা।

স্পেনের ফুটবলার দানি অলমোর কথায় সেটিই সবচেয়ে স্পষ্ট। তার মতে, অতীতের কোনো অর্জন মাঠে বাড়তি সুবিধা এনে দেয় না। প্রতিটি ম্যাচ নতুন, প্রতিটি প্রতিপক্ষ নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই স্পেনের পুরো মনোযোগ এখন কেবল পরবর্তী ম্যাচে।

অলমো বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ম্যাচকেই এক একটি ফাইনাল মনে করে মাঠে নামি। কোচের সরল বার্তা-পরের ম্যাচটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। পরের ৯০ মিনিটেই চোখ! ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকা আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল না, আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো প্রতিটি ম্যাচ জেতা।’

এই মানসিকতাই লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনকে অন্যদের থেকে আলাদা করছে। দলটি প্রতিপক্ষকে সমীহ করলেও নিজেদের ফুটবল দর্শন থেকে সরে আসতে রাজি নয়। ছোট ছোট পাস, বলের দখল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে সুযোগ তৈরি করা-স্পেন এখনও সেই পরিচিত ছকেই খেলছে। তবে এবারের স্পেনকে আলাদা করেছে তাদের রক্ষণ।

চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কোনো দলই স্পেনের জালে বল পাঠাতে পারেনি। গোলরক্ষক উনাই সিমন দুর্দান্ত ফর্মে থাকলেও অলমোর মতে, এটি কেবল একজনের সাফল্য নয়। পুরো দল একসঙ্গে রক্ষণে কাজ করায় এই সাফল্য এসেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কৌশলটা পরিষ্কার-সবাই মিলে আক্রমণ করা আর সবাই মিলে রক্ষণ সামলানো। কোচ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলের স্ট্রাইকারই হলেন প্রথম ডিফেন্ডার। উনাই এবং আমাদের ডিফেন্স লাইন দুর্দান্ত খেলছে। আমরা যদি নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে পারি, তবে জয় আমাদের হাতের মুঠোয় আসবেই; কারণ, গোল করার মতো সুযোগ আমরা প্রতিনিয়ত তৈরি করছি।’

স্পেনের এই দর্শনে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। একজন ফরোয়ার্ড শুধু গোল করবেন না, রক্ষণেও অবদান রাখবেন। আবার একজন ডিফেন্ডার শুধু বল ক্লিয়ার করবেন না, আক্রমণ গড়ার সূচনাও করবেন। আধুনিক ফুটবলে এই সমন্বিত দর্শনই এখন স্পেনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আক্রমণে অবশ্য আলো কেড়ে নিচ্ছেন দুই তরুণ-লামিনে ইয়ামাল ও পেদ্রি। ইয়ামাল হয়তো নিয়মিত গোল পাচ্ছেন না, কিন্তু তাঁর ড্রিবলিং, গতি এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখার ক্ষমতা স্পেনের আক্রমণকে অনেক বেশি কার্যকর করে তুলছে। অন্যদিকে মাঝমাঠে পেদ্রি যেন পুরো দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছেন।

পেদ্রির গুরুত্ব তুলে ধরে অলমো বলেন, ‘পেদ্রিকে মাঠে দেখাটা একটা পরম আনন্দ। ও থাকা মানেই দলের শক্তি দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া। আমাদের কৌশলে ও অপরিহার্য।’

তবে স্পেন জানে, বেলজিয়ামকে হারানো সহজ হবে না। প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগে এমন কয়েকজন ফুটবলার আছেন, যারা এক মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। তাই স্পেনের লক্ষ্য থাকবে নিজেদের পরিচিত পজেশন-ভিত্তিক ফুটবল খেলেই ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা।

এ ছাড়া স্পেনের আরেকটি বড় শক্তি তাদের বেঞ্চ। প্রথম একাদশের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের মানও এতটাই উঁচু যে ম্যাচের যেকোনো পর্যায়ে পরিবর্তন এনে নতুন গতি যোগ করা সম্ভব। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে এই গভীরতাই অনেক সময় শিরোপা নির্ধারণ করে দেয়।

স্পেনের সামনে আজ শুধু একটি কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, নিজেদের শিরোপা-স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ। টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড কিংবা অভেদ্য রক্ষণ তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব হিসাবই মেলাতে হবে মাঠে। কারণ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অতীতের পরিসংখ্যান নয়, একটি ম্যাচের পারফরম্যান্সই লিখে দেয় ইতিহাস।

কোয়ার্টার ফাইনাল

স্পেনবেলজিয়াম

সরাসরি, রাত ১টা

বিটিভি, টি স্পোর্টস ও সময় টিভি

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *