কখনো কখনো ফুটবল শুধু আক্রমণের খেলা নয়, অপেক্ষারও খেলা। প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে গোলের পর গোল করার বদলে কিছু দল ধৈর্য ধরে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করে। সেই মুহূর্ত এলেই এক আঘাতে ম্যাচ নিজেদের করে নেয়। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জেতা স্পেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল এটাই। ১৬ বছর পর ডালাসে পর্তুগালের বিপক্ষে সেই পুরোনো স্পেনকেই যেন আবার দেখা যায়!
নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার অপেক্ষা, অতিরিক্ত সময়ের প্রস্তুতি-সবকিছুই যখন প্রায় নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল, তখনই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিলেন দুই বদলি ফুটবলার। যোগ করা সময়ে ফেরান তোরেসের নিখুঁত পাস ধরে গোল করেন মিকেল মেরিনো। সেই এক গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
এই জয় শুধু শেষ আট নিশ্চিত করার গল্প নয়। এটি ছিল স্পেনের ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং বেঞ্চের গভীরতারও প্রমাণ। ম্যাচজুড়ে পর্তুগাল লড়াই করেছে সমানতালে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে-স্পেনের পরিকল্পনা ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে সুযোগ বের করে আনা। আর সেই পরিকল্পনাই সফল হয়েছে যোগ করা সময়ে।
স্পেনের জয়ের নায়ক মিকেল মেরিনো অবশ্য বড় ম্যাচে শেষ মুহূর্তে নায়ক হওয়ার নতুন কেউ নন। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে জার্মানির বিপক্ষেও শেষ সময়ে গোল করে দলকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। এবার বিশ্বকাপেও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন।
ম্যাচ শেষে নিজের এই নির্ভরযোগ্য ফুটবলারকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিনি বলেন, ‘মিকেল মেরিনো কখনোই আমাদের হতাশ করে না। সে নিশ্চিত ভরসা। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতিয়েছে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সব সময় সে হাজির থাকে। নিজের পজিশনে সে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমাদের বেঞ্চে এমন খেলোয়াড় আছে, যারা অন্য যেকোনো জাতীয় দলে শুরুর একাদশে খেলত।’
মেরিনোর জন্য রাতটি ছিল আরও বেশি আবেগের। কয়েক মাস আগেও বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনাই ছিল অনিশ্চিত। সেই জায়গা থেকে উঠে এসে এখন তিনি দলের নায়ক।
আবেগাপ্লুত মেরিনো বলেন, ‘কয়েক মাস আগেও এখানে থাকা কল্পনাতীত ছিল। আর এখন আমি বিশ্বের শীর্ষে আছি, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখের মুহূর্তগুলোর একটি উপভোগ করছি। প্রতিটি পরিশ্রম আর প্রতিটি সন্দেহের মুহূর্ত আজ সার্থক।’
তবে ডালাসের রাতটি শুধু শেষ মুহূর্তের গোলের জন্য নয়, ইতিহাস গড়ার জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পর্তুগালকে গোল করতে না দিয়ে বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচ ক্লিন শিট রাখার নতুন রেকর্ড গড়েছে স্পেন। এর আগে ১৯৯০ সালে ইতালি এবং ২০০৬ থেকে ২০১০ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ড টানা পাঁচ ম্যাচ গোল না খাওয়ার রেকর্ড গড়েছিল। এবার সেই রেকর্ড এককভাবে নিজেদের করে নিল স্প্যানিশরা।
এই রেকর্ডের আরেক নায়ক গোলরক্ষক উনাই সিমোন। পর্তুগালের বিপক্ষে গোল না খেয়ে তিনি বিশ্বকাপে টানা ৬০৯ মিনিট প্রতিপক্ষকে গোলবঞ্চিত রাখার নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
তবে এই সাফল্যের কৃতিত্ব একজনের নয় বলে মনে করেন দে লা ফুয়েন্তে। স্প্যানিশ কোচ বলেন, ‘এই রেকর্ড শুধু উনাইয়ের নয়, তার সতীর্থদেরও। তাদের সংহতি, উদারতা, পরিশ্রম আর আত্মত্যাগের ফল এটি। সবাই একে অপরের জন্য দৌড়ায়।’
এখন সামনে আরও বড় পরীক্ষা। আগামী ১০ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার সোফি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে স্পেন। তবে ডালাসে তারা যে বার্তা দিয়েছে, তা স্পষ্ট-এই দলটি শুধু সুন্দর ফুটবল খেলতেই আসেনি, শিরোপা জিততেও প্রস্তুত।
এসএন/পিডিকে