পাবনায় দুই তরুণ বন্ধুর স্ট্রবেরি চাষে সাফল্য

পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের হিদৈসকোল গ্রামের ডেঙ্গারগ্রাম এলাকার দুই বন্ধুর স্ট্রবেরি বাগান।

পাবনার মাটিতে লাল স্বপ্নের বুনন। দুই তরুণ, দুই বছরের সংগ্রাম, দুই লাখ টাকার ঝুঁকি আর শেষ পর্যন্ত এক অনুপ্রেরণার গল্প।

পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের হিদৈসকোল গ্রামের ডেঙ্গারগ্রাম এলাকার দুই বন্ধু হলেন- মো. নুরুল ইসলাম (২০) ও মো. আব্দুল আওয়াল (২০)। তারা দুজনই কলেজের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে হাত লাগান। কিন্তু তাদের স্বপ্ন ছিল আলাদা চাকরির পেছনে নয়, নিজেরাই হবেন উদ্যোক্তা।

দুই লক্ষ টাকার স্বপ্ন, দুই বছরের কঠিন পরীক্ষা

স্বপ্নের পুঁজি গড়েছেন নিজেরাই। পড়াশোনার ফাঁকে অন্যত্র কাজ করে জমানো অর্থ আর ইউটিউব ঘেঁটে, পরিচিতদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত, সব মিলিয়ে লক্ষ্য একটাই করতেই হবে ব্যতিক্রম কিছু।

বাড়ির পাশের ২০ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন স্ট্রবেরি চাষ। শুরুতেই বিনিয়োগ প্রায় ২ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। প্রথম বছর আশানুরূপ ফলন নেই। দ্বিতীয় বছরও ব্যর্থতা। জমির লিজ, চারা, সার, পরিচর্যা সব মিলিয়ে খরচ বাড়তেই থাকে। টানা দুই বছরে প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়ে যায়। হিসাব কষে দেখেন, এবার ভালো ফলন হলেও পূর্বের প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। অনেকে বলেছিল, এই ফল এ এলাকায় হবে না। কিন্তু তারা দমে যায়নি। তারুণ্যতো দমে যাবার নয়।

তৃতীয় বছরে এসে বদলে যায় দৃশ্যপট। গাছে গাছে লাল টসটসে স্ট্রবেরি। স্বাদে-মানে দারুণ। তারা শহরের ফলের দোকান ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিক্রির উদ্যোগ নেন। ব্যবসায়ীরাও আগ্রহ দেখান।

এরপর বাগানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মাত্র সাত দিনের মধ্যে ভাইরাল। প্রতিদিন শতশত মানুষ বাগান দেখতে আসছেন। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন অনেকে। নিজের হাতে গাছ থেকে স্ট্রবেরি তুলে কিনছেন।

উদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম বলেন, প্রথম দুই বছর শুধু লোকসান আর হতাশা ছিল। এখন প্রতিদিন মানুষ আসছে, নিজের হাতে ফল তুলে নিচ্ছে—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।

আরেক বন্ধু উদ্যোক্তা আব্দুল আওয়াল বলেন, আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম—ইচ্ছে থাকলে গ্রামেও ব্যতিক্রম কিছু করা যায়।

সম্ভাবনার ফসল, বড় স্বপ্নের শুরু

বর্তমানে বাংলাদেশে স্ট্রবেরি উচ্চমূল্যের সম্ভাবনাময় ফল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এর চাষ বাড়ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সঠিক পরিচর্যা ও বাজার সংযোগ থাকলে প্রতি বিঘায় পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকার ফল বিক্রি সম্ভব।

দুই বন্ধুর হিসাব বলছে, প্রতি বিঘায় জমির লিজসহ ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। ফলন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ হলে খরচ বাদ দিয়ে উল্লেখযোগ্য লাভ করা সম্ভব।

এবার তারা আশা করছেন, আগের দুই বছরের লোকসান পুষিয়ে উঠে লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন পুঁজি। আগের সঞ্চয় প্রায় শেষ। পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে চাষাবাদে যেতে চাইলে প্রয়োজন আরও বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ। তাদের চাওয়া সরকারি সহায়তা ও কৃষি প্রশিক্ষণ। স্বপ্ন নিজেদের গ্রামকে স্ট্রবেরির জন্য পরিচিত করা।

নুরুলের কণ্ঠে দৃঢ়তা, আমরা চাই আমাদের গ্রাম থেকেই ভালো মানের স্ট্রবেরি সারা দেশে যাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *