বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কি বড় ধরনের প্রভাব পড়বে?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরগুলোর একটি ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে আয়োজক শহরগুলোকে সাধারণত বিপুল অর্থনৈতিক লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পর্যটকের ঢল, হোটেল বুকিং বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান এবং বিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে- এমনটাই প্রত্যাশা করা হয়।

তবে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, প্রত্যাশার তুলনায় কম হোটেল বুকিং এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্বকাপের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। খবর আল জাজিরার। 

ভিসা জটিলতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক দর্শকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে মার্কিন সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)সহ কয়েকটি সংগঠন বিদেশি দর্শকদের সতর্ক করে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

এদিকে ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিদেশি সমর্থক সময়মতো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হোটেল বুকিং প্রত্যাশার থেকেও কম

আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেলের বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে কম। জরিপে অংশ নেওয়া হোটেলগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ এই অবস্থার জন্য ভিসা জটিলতা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছে।

বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজক নিউইয়র্ক সিটিতে বুকিং প্রত্যাশার মাত্র ৬৫ শতাংশে রয়েছে। সিয়াটলের প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেলও গ্রীষ্মকালীন স্বাভাবিক বুকিংয়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।

কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় হোটেল শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, ফিফা বিশ্বকাপ প্রত্যাশিত মাত্রার পর্যটক আকর্ষণ করতে পারেনি।

তবুও আশাবাদী কিছু খাত

তবে আতিথেয়তা ও পর্যটন খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান এখনও আশাবাদী। আবাসন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান চেস্কি জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৮ বছরের ইতিহাসে বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বুকিং হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ডালাসে জুন মাসের ম্যাচ উপলক্ষে দুই রাতের জন্য একটি এয়ারবিএনবির ভাড়া প্রায় ৭০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনালের আগে আশপাশের কিছু আবাসনের ভাড়া ৫ হাজার ৬০০ ডলারেরও বেশি।

বিমান ভ্রমণে চাহিদা বৃদ্ধি

হোটেল খাতে মন্দাভাব থাকলেও বিমান ভ্রমণে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সোজার্নের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় হিউস্টনে ফ্লাইট বুকিং ৩৮ শতাংশ এবং ডালাসে ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এসব বুকিংয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকারীদের। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কম উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, কারণ বিদেশি পর্যটকরা সাধারণত দেশীয় পর্যটকদের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করেন।

টিকিটের দাম নিয়ে ক্ষোভ

বিশ্বকাপের টিকিটের উচ্চমূল্যও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপভিত্তিক সংগঠন ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসসি) টিকিট মূল্য বৃদ্ধিকে ‘চরম শোষণ’ এবং ‘সমর্থকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ডালাসের প্রাথমিক ম্যাচগুলোর অনেক টিকিটের দাম ৮০০ ডলারের বেশি। অন্যদিকে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল ম্যাচের টিকিট পুনর্বিক্রয় বাজারে ৯ হাজার ২০০ ডলার থেকে শুরু করে ৪৩ হাজার ৫০০ ডলারেরও বেশি দামে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে ফিফার ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে, যেখানে চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম বাড়ানো হয়।

স্থানীয় জনগণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ

নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সীমিতসংখ্যক ৫০ ডলারের টিকিট লটারির মাধ্যমে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি সেন্ট্রাল পার্কে ৫০ হাজার দর্শকের জন্য ফাইনাল ম্যাচের বড় পর্দায় প্রদর্শনেরও আয়োজন করা হচ্ছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, বিশ্বকাপ উপভোগ করতে মানুষের হাজার হাজার ডলার খরচ করার প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।

অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অনেক শহর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। হিউস্টনে নতুন গণপরিবহন ও সাইকেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একইভাবে কানসাস সিটি স্ট্রিটকার সম্প্রসারণ ও অতিরিক্ত বাস সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজন অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের গতি বাড়িয়ে দেয়, যা ভবিষ্যতে স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

অনিশ্চিত অর্থনৈতিক হিসাব

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়লেও প্রত্যাশিত ‘অর্থনৈতিক বোনাঞ্জা’ বা বিশাল আর্থিক লাভ আদৌ হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ভিসা জটিলতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টিকিটের চড়া দাম এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকের কম আগ্রহ—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে আয়োজক শহরগুলোর আশা, খেলা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ প্রত্যাশিত পর্যটক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *