আশরাফুলের ছোঁয়ায় যেভাবে বদলে গেলো বাংলাদেশের ব্যাটিং

সেই টেস্ট অভিষেকের পর থেকে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একটি কাজই করেছে বেশি—হেড কোচ, ব্যাটিং কোচ, বোলিং কোচ, ফিল্ডিং কোচ, ফিজিও, ট্রেনার ও কম্পিউটার অ্যানালিস্ট হিসেবে বিদেশিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ দলের পুরো কোচিং স্টাফ দীর্ঘদিন ধরেই ভিনদেশিতে ঠাসা। বিভিন্ন সময়ে অনেক নামী, দামি ও হাই-প্রোফাইল কোচ কাজ করেছেন। কিন্তু সে অর্থে খুব বেশি কার্যকারিতা পাওয়া যায়নি। বরং ভক্ত ও সমর্থকদের আফসোস আর আক্ষেপই বেশি শোনা গেছে।

‘এত টাকা দিয়ে একঝাঁক ভিনদেশি কোচ আনা হয়, রাখা হয়; কিন্তু চোখে পড়ার মতো উন্নতি নেই। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে তাহলে এই কোচদের পুষে লাভ কী?’ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি ভক্ত ও সমর্থকদের মুখে উচ্চারিত একটি সংলাপ এটি।

সেই সঙ্গে আরও একটি কথাও শোনা গেছে। সব জায়গায় বিদেশি স্পেশালিস্ট কোচ না রেখে একজন হাইপ্রোফাইল, অভিজ্ঞ, কর্মপটু ও দক্ষ বিদেশি হেড কোচের সঙ্গে ব্যাটিং ও বোলিং কোচ হিসেবে বাংলাদেশের সাবেক তারকা ব্যাটার ও বোলারদের রাখা হলে ক্ষতি কী? পরীক্ষামূলকভাবে তাদের কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব দিয়ে দেখা যাক না, তারা কেমন করেন!

অবশেষে সমর্থকদের সেই দীর্ঘলালিত স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। অনেকদিন পর এবার ঘরের মাঠে পাকিস্তানের সঙ্গে হেড কোচ ফিল সিমন্স, পেস বোলিং কোচ শন টেইট এবং স্পিন কোচ মোশতাক আহমেদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিন বাংলাদেশি কোচ—মোহাম্মদ সালাউদ্দীন, মোহাম্মদ আশরাফুল ও আশিকুর রহমান।

এর মধ্যে মোহাম্মদ সালাউদ্দীন প্রধান সহকারী কোচের ভূমিকায় কাজ করেছেন দেড় বছরের বেশি সময়। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর জাতীয় দলের সিনিয়র প্রধান সহকারী কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন সালাউদ্দীন। এ বছরের ১ জুন থেকে তিনি জাতীয় দল থেকে সরে হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের হেড কোচের দায়িত্ব শুরু করবেন।

আর মোহাম্মদ আশরাফুল ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করছেন সাত মাস ধরে; গত নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট সিরিজ থেকে। তার সঙ্গে আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিসিবির চুক্তি রয়েছে। আর ফিল্ডিং কোচ আশিক শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ফিল্ডিং কোচের ভূমিকায় ছিলেন।

দুই বন্ধু আশরাফুল ও আশিক একসঙ্গে কাজ করেছেন সর্বশেষ সিরিজে। সফলও হয়েছেন। চোখে পড়ার মতো উন্নতি দেখা গেছে ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংয়ে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজে টাইগাররা শুধু ২-০ ব্যবধানে সিরিজই জেতেনি, সামগ্রিকভাবে ব্যাটিংও করেছে বেশ ভালো। ফিল্ডিং, বিশেষ করে ক্যাচিংয়েও টাইগাররা রেখেছেন দক্ষতার ছাপ। সে অর্থে বড় ধরনের ভুলত্রুটি চোখে পড়েনি। ভাইটাল ক্যাচ হাতছাড়ার ঘটনাও ঘটেনি তেমন। বরং কয়েকটি কঠিন ক্যাচ বেশ ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতার সঙ্গে ধরেছেন টাইগাররা।

খুব স্বাভাবিকভাবেই ভক্ত ও সমর্থকেরা খুশি ও সন্তুষ্ট। তাদের কথা, অনেক অর্থ ব্যয়ে আগে নামী, দামি ও হাইপ্রোফাইল বিদেশি কোচ কাজ করেছেন। দেরিতে হলেও বিসিবি দেশি কোচদের মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে এবং স্থানীয় কোচদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সুযোগ পেয়ে দেশি কোচরাও দেখিয়ে দিয়েছেন—আমরাও পারি। এবারের পাকিস্তান সিরিজে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা পাকিস্তানিদের চেয়ে অনেক ভালো পারফর্ম করেছেন।

সবচেয়ে বেশি প্রশংসায় ভাসছেন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। গত বছরের নভেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ড সিরিজে দায়িত্ব নেওয়ার পর আশরাফুলের কোচিংয়ে বাংলাদেশের ব্যাটারদের ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা বেড়েছে। ব্যাটারদের ব্যাট থেকে বড় ইনিংসও এসেছে বেশি। একটি ছোট পরিসংখ্যানই বলে দেবে, আশরাফুলের কোচিংয়ে ব্যাটারদের পারফরম্যান্সে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে।

jagonews

আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের সঙ্গে মোট চার টেস্টে ব্যাটিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। এই চার টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটারদের ব্যাট থেকে এসেছে সাতটি সেঞ্চুরি এবং এক ডজন ফিফটি। ইনিংসপ্রতি গড় স্কোর ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। এই চার টেস্টে বাংলাদেশ তিনবার ৪০০ বা তার বেশি রান করেছে। আড়াইশোর নিচে স্কোর ছিল মাত্র একবার—ঢাকায় পাকিস্তানের সঙ্গে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ উইকেটে ২৪০ ডিক্লেয়ার।

আশরাফুলের কোচিংয়ে গত সাত মাসে ওয়ানডে ফরম্যাটে ছয় ম্যাচে চার জয় এসেছে। দুইটিতে সেঞ্চুরি করেছেন ব্যাটাররা।

আশরাফুল যখন ব্যাটিং কোচ ছিলেন না, তখন বাংলাদেশের ব্যাটাররা খুব খারাপ খেলেছেন, তেমনও নয়। তবে একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো—নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও সাদমান ইসলামদের ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা বেড়েছে।

টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত গত বছর গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে উভয় ইনিংসে (১৪৮ ও ১২৫) শতরানের কৃতিত্ব দেখান। এবার ঢাকায় পাকিস্তানের সঙ্গেও সেই সাফল্যের প্রায় পুনরাবৃত্তি ঘটানোর পথে ছিলেন। প্রথম ইনিংসে শতরান (১২৮) করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৩ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করেন শান্ত।

মুশফিকুর রহিমও আশরাফুল ব্যাটিং কোচ হওয়ার আগে গত বছর টেস্ট সেঞ্চুরি করেছিলেন। এবারও সিলেটে শেষ টেস্টে দুর্দান্ত শতক উপহার দিয়েছেন মুশফিক।

২০২৫ সালের জুনে শ্রীলঙ্কার মাটিতে লঙ্কানদের কাছে ইনিংস ও ৭৮ রানে হারের ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের স্কোর নেমে গিয়েছিল ১৩৩-এ। সেই টেস্টে কোনো সেঞ্চুরি তো দূরের কথা, একটি অর্ধশতকও ছিল না।

২০২৫ সালের এপ্রিলে সিলেটে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে প্রথম টেস্টে ৩ উইকেটের জয়ের ম্যাচেও দলীয় স্কোরলাইন ছিল না হৃষ্টপুষ্ট। প্রথম ইনিংসে ১৯১ (মুমিনুল ৫৬) এবং ২৫৫ দ্বিতীয় ইনিংসে (শান্ত ৬০, জাকের আলী ৫৮)।

চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ইনিংস এবং ১০৬ রানের জয় আসে ওপেনার সাদমানের (১২০) ও মিডল অর্ডার ব্যাটার মেহেদী হাসান মিরাজের (১০৪) জোড়া শতকে।

মোদ্দা কথা, পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে ধারাবাহিকতা বেড়েছে। আর গড়পড়তা স্কোরলাইনও লম্বা হয়েছে। আশরাফুল সেই কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন। কিন্তু বিনয়ী আশরাফুল মোটেই তা করতে নারাজ।

নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আর কী মূল্যায়ন করব বলুন! নিজের সাফল্যের কথা আমি কী করে বলি? এটা তো আপনারা, ভক্ত-সমর্থক আর বিশেষজ্ঞরাই মূল্যায়ন করবেন। আমি তো আর নিজের সাফাই গাইতে পারি না।’

‘তবে এটুকু বলতে পারি—শেষ চার টেস্টে সাত সেঞ্চুরি, ১২টি ফিফটি, প্রত্যেক ইনিংসে গড়পড়তা ৩০০-এর বেশি স্কোর এবং ওয়ানডেতে ছয় ম্যাচে চার জয়, যেখানে দুটিতে সেঞ্চুরি হয়েছে—এসব অবশ্যই সন্তোষজনক। তারপরও পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলার কিছু নেই।’

‘এ পর্যায়ে জাতীয় দলের ব্যাটারদের টেকনিক নিয়ে কাজ করার খুব বেশি কিছু নেই। তাদের চাঙা রাখা, আত্মবিশ্বাসী করে তোলাই প্রধান কাজ। আমার চেষ্টা থাকবে ব্যাটারদের ভালো খেলতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করা। তাদের সেরাটা বের করে আনা।’

আশরাফুল নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত দলের ব্যাটারদের সেরাটা বের করে আনতে পেরেছেন। তবে তার আসল পরীক্ষা হবে অস্ট্রেলিয়া সফরে দুই টেস্টের সিরিজে। তার আগে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সীমিত ওভারের সিরিজও আছে। সেগুলোতে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারলেই হয়তো পুরোপুরি তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারবেন দেশের ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *