লড়াই আর সৌন্দর্যের মিশেলে লিটনের মহাকাব্যিক সেঞ্চুরি

নানা চড়াই-উতরাই, উৎকণ্ঠা আর নখ-কামড়ানো মুহূর্ত পেরিয়ে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত মাইলফলকে পৌঁছালেন লিটন দাস। যখন শতরান পূর্ণ করলেন, তখন স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় দুই হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে করতালিতে তাকে অভিবাদন জানান। এটি টেস্ট ক্রিকেটে লিটনের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি, আর পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয়।

৯৯ রানে থাকা অবস্থায় খুররাম শাহজাদকে দৃষ্টিনন্দন কাভার ড্রাইভে চার মেরে লিটনের রান পৌঁছে যায় ১০৩-এ। বল সীমানা ছোঁয়ার আগেই উৎকণ্ঠা রূপ নেয় উল্লাসে। অস্বস্তি আর চাপের মুহূর্ত পেরিয়ে ফিরে আসে আনন্দের আবহ।

সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর হেলমেট খুলে দুই হাত প্রসারিত করে ড্রেসিংরুমের দিকে তাকিয়ে থাকেন লিটন। সেখানে দাঁড়িয়ে সতীর্থরা তাকে জানাচ্ছিলেন অভিনন্দন। সেঞ্চুরিয়ানও উপভোগ করেন বিশেষ সেই মুহূর্ত। ব্যাট উঁচিয়ে চারপাশের দর্শকদের ভালোবাসার জবাব দেন ভালোবাসাতেই।

ঘাম ঝরানো ধ্রুপদী এক ইনিংসে টেস্ট ক্রিকেটে নিজের নামের পাশে লিটন যোগ করলেন আরও একটি সেঞ্চুরি। হিসেবি ব্যাটিং, ধৈর্য, গোছানো মানসিকতা, প্রতিটি রান আদায়ের লড়াই এবং চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, সব মিলিয়ে এই ইনিংসে ধরা দিয়েছে এক ভিন্ন লিটন। যে লিটন প্রতিপক্ষের জন্য কেবলই এক বড় হুমকি।

দলীয় ১১৬ রানে পুল শট খেলে মিরাজ যখন সাজঘরের পথ ধরলেন তখন লিটন অপরপ্রান্তে কেবল ২ রানে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের ষষ্ঠ ব‌্যাটসম‌্যান ড্রেসিংরুমে। লিটনের লড়াইটা তখন শুরু হয় লেজের ব‌্যাটসম‌্যানদের নিয়ে। মিশন একটাই, দলকে ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা।

সেই লড়াইয়ে ব‌্যাটসম‌্যান হিসেবে নিঃসঙ্গ শেরপা লিটন। বাকিরা হচ্ছেন তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুল। যারা লিটনকে শুধু সাহসই দেননি বরং উইকেট আগলে রেখে দিয়েছেন যুদ্ধের প্রেরণা, লড়াইয়ের জেদ।

তাইজুলের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে লিটনের জুটি ৬০ রানের। দুজন মিলে বল খেলেছেন ১১৪টি। অষ্টম উইকেটে তাসকিন ও লিটন ৪২ বলে যোগ করেন ৩৮ রান। নবম উইকেটে শরিফুল ও লিটনের শেষ জুটি ৬৪ রানের। যা হয়েছে ৭৩ বলে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিটাই এসেছেন নবম উইকেটে।

দলকে ধ্বংসস্তুপ থেকে টেনে তুলে অভাবনীয় ইনিংস খেলার রেকর্ড আগেও আছে লিটনের। আছে পাকিস্তানের বিপক্ষেও। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই বছর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে লিটন ও মিরাজ ১৬৫ রানের জুটি গড়েন। প্রায় শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে লিটন ওই ইনিংসে একাই করেন ১৩৮ রান।

২০২১ সালে চট্টগ্রামে ৪৯ রান তুলতে ৪ উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে মুশফিকুরকে নিয়ে তার জুটি ছিল ২০৬ রানের। মুশফিকুর ৯ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করলেও লিটন ১১৪ রান করেন অনায়েসে। ক‌্যারিয়ার সেরা ইনিংসটি ১৪১ রানের। ওই ইনিংস যখন খেলতে নামেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তখন দলের স্কোর ৫ উইকেটে ২৪। মুশফিকুর নিয়ে তার জুটি ২৭২ রানের।  

আজকের ইনিংস পাচ্ছে ভিন্ন মাত্রা। কেননা লড়াইটা হয়েছে প্রতিষ্ঠিত ব‌্যাটসম‌্যান ছাড়া। লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে তার অপ্রতিরোধ্য লড়াই বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে সম্মানজনক অবস্থানে। ২৭৮ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস। যেখানে লিটনের একার রান ১২৬। ১৫৯ বলে ১৬ চার ও ২ ছক্কায় সাজানো তার ঐশ্বর্যের ১২৬। 

পাকিস্তানের বিপক্ষে লিটনের লড়াইটা ছিল হিসেব কষে করা। তাইজুল, তাসকিন, শরিফুলদের ওপর নিজের আস্থা থাকলেও তাদেরকে পাকিস্তানের বোলারদের সামনে পড়তে দেননি। ওভারের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ বলে নিয়েছেন সিঙ্গেল। আর নিজের খেলা ওভারের শুরুর ব্যাটিংয়ে খুঁজেছেন চার কিংবা ছয়।

কখনো ডাউন দ্য উইকেটে এসেছেন। কখনো জায়গায় দাঁড়িয়ে করেছেন পুল কিংবা হুক। স্পিনার সাজিদ খানকে সুইপ শটে কতবার যে নাস্তানাবুদ করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। মিড উইকেট, ডিপ মিড উইকেট, ফাইন লেগ কিংবা লং অন ও বা অফ বাউন্ডারি দিয়ে লিটন যতবার বল বাউন্ডারিতে পাঠিয়েছেন ততবারই গ্যালারি জেগে উঠেছে।

তাইতো সেঞ্চুরি পূরণের পর তাকে নিয়ে দর্শকদের উন্মাদনা, ড্রেসিংরুমের উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো। সবুজের গালিচায় সেঞ্চুরির ফুল ফুটিয়ে শোভা ছড়িয়ে দিলেন। প্রথম দিনই সেই সুবাতাস ছড়িয়ে গেল প্রবলভাবে। বাংলাদেশ দিনের লড়াইয়ে কিছুটা এগিয়ে। 

সেঞ্চুরিতে পৌঁছতে কতো নাটকীয়তা! ৯৩ রানে থেকে খুররাম শাহজাদকে ফ্লিক করে চার। ৯৭ রানে থেকে ওভারের দ্বিতীয় বলে নেন ১ রান। ওভারের বাকি চার বলে তখন শরিফুলের টিকে থাকার লড়াই। কোনো মতে তা পার করে দেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।

পরের ওভারে সাজিদ খানের বল ড্রাইভ করে কাভারে পাঠিয়েছিলেন। দৌড়ে ২ রান নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফিল্ডারের হাতের নাগালে বল থাকায় ১ রানে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। ৯৯ রানে নট আউট লিটন। আবার তার অপেক্ষা বাড়ে।

শরিফুল দ্বিতীয় বলে আত্মবিশ্বাসী শটে চার পেলেও তৃতীয় বলে আম্পায়ার তাকে এলবিডব্লিউ দেন। রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান শরিফুল। এরপর ওভারের বাকি তিন বল কোনোমতে কাটিয়ে দেন। এরপর ড্রিংকস ব্রেক। লিটনের অপেক্ষা আবার বাড়ে। বাড়ে চিন্তা। সেঞ্চুরি হবে তো? 

৫ মিনিটের অপেক্ষার পর লিটন নতুন ওভারের দ্বিতীয় বলে চার মেরে পৌঁছে যায় সেঞ্চুরির স্বর্গে। 

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *