তিস্তার ভাঙনে হুমকিতে কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা, স্থায়ী সমাধান দাবি ভুক্তভোগীদের

তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। এতে জীবন-জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন নদীতীরবর্তী মানুষ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাঙনের কারণে প্রতিদিনই জমি হারাচ্ছেন কৃষকেরা। ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন ফসলি জমি নদীতে চলে যাওয়ায় জীবিকা সংকটে পড়েছেন তারা। অনেক বসতবাড়িও এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে, ফলে আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।

তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিমে। প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর এটি নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধার হরিপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। নদীটির বাংলাদেশ অংশ প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার তিস্তা নদীর প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনপ্রবণতা রয়েছে। এর মধ্যে রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ারডাঙ্গা ইউনিয়নের রামহরি এলাকায় ৪০০ মিটার, নাজিমখান ইউনিয়নের একটি অংশে ৫০০ মিটার, উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের চাপড়ারপাড়ে ১ হাজার মিটার, সাদুয়ারদামারহাটে ৫০০ মিটার এবং বজরা এলাকায় ৭০০ মিটার এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়লেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না। শুধু অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল দিচ্ছে না।

রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের পলাশপুর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিনই নদী আমাদের জমি গ্রাস করছে। এখন ঘরবাড়িও ঝুঁকিতে। আমরা পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।’

একই এলাকার গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন, ‘ভাঙনের ভয়ে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না। প্রতিবারই কাজের আশ্বাস পাই, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না।’

কৃষক মোকসেদ আলী বলেন, ‘আমার চাষের জমি নদীতে চলে গেছে। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দ্রুত স্থায়ী সমাধান চাই।’

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “নেদারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের বসতভিটাসহ গৃহ নির্মাণে সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সে ধরনের ব্যবস্থা নেই। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন জরুরি।”

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কার্যকর নীতিমালা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে, রংপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এক লাখ জিও ব্যাগে বালু ভর্তি করে ভাঙনরোধে ফেলা হবে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবার একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতি বছরই নতুন করে মানুষ নদীভাঙনের কবলে পড়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *