ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের জন্য আগামীকাল বুধবার (৮ এপ্রিল) তফসিল ঘোষণা করা হবে। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। গত সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে সরকার গঠনের পর এখন সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে বিএনপি। এরই মধ্যে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা যে যার মতো করে লবিং, তদবির ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো তাদের প্রাপ্ত আসনসংখ্যা অনুসারে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি জোট পাবে ৩৬টি আসন, জামায়াত জোট পাবে ১৩টি আসন এবং একজন স্বতন্ত্র আসন পাবেন। বিএনপি জোটের জন্য বরাদ্দ ৩৬টি আসনে শেষ পর্যন্ত কারা চূড়ান্ত মনোনয়ন পাচ্ছেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গণে চলছে জল্পনা-কল্পনা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর আগ্রহী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা রয়েছে। পরে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন— জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের বর্তমান সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি এবং রেহেনা আক্তার রানু।
এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা, সানজিদা ইসলাম তুলি, নাদিরা চৌধুরীও আলোচনায় আছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ এবং বিএনপির এক সময়ের প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনির নামও তালিকায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সূত্রে আলোচনায় রয়েছেন—সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, বিএনপির সাবেক এমপি প্রয়াত আমান উল্লাহ চৌধুরী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী প্রয়াত বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর মেয়ে নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, লন্ডন বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের মেয়ে সাবরিনা খান এবং মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া বা এই পরিবারের অন্য কোনো সদস্য।
এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন—ঢাকা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সেলিনা সুলতানা নিশিতা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, পাবনার সাথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন নাহার ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা।
মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী, বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরুদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্র, ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহারীন খান, মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন—তাদের নিয়েও চলছে হিসাব-নিকাশ।
শিক্ষা ও পেশাজীবী অঙ্গন থেকেও বেশ কয়েকজন আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক ভিপি অধ্যাপক নাজমা সুলতানা ঝংকার, সেলিনা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাজমেরি ইসলাম, অধ্যাপক তাহমিনা বেগম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নাহারিন খান, ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়াইরিস সিমকি, সাংবাদিক কাজী জেসিন, ফাতেমা বিনতে দোহা ও ছাত্রদল নেত্রী মানসুরা আক্তারের নামও উঠে এসেছে সম্ভাব্য তালিকায়।
এছাড়া সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে আরও কিছু পরিচিত মুখ চূড়ান্ত তালিকায় যুক্ত হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসন না সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ—কোনটিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সেলিনা সুলতানা নিশিতা সরকার নিউজকে বলেন, দুই ব্যবস্থারই নিজস্ব গুরুত্ব আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে তরুণ প্রার্থী হিসেবে কী ধরনের দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান সবসময় আমাদের জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে এবং দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি করার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, ‘আমি চাই গত ১৭ বছর যারা রাজপথে ছিল, ত্যাগ-তিতীক্ষা রয়েছে তারা সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত হবেন। দল সেই বিবেচনায় মনোনয়ন দেবে। আমি আশাবাদী। হাইব্রিডদের ভিড়ে যেন আমরা হারিয়ে না যাই।’
সম্ভাব্য প্রার্থী বীথিকা হোসাইন বলেন, ‘আমার স্বামী প্রয়াত শফিউল বারী বাবু দলে অবদান রেখেছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে জাতীয়তাবাদী দলের যারা নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের পাশে থেকেছি। সরকারের অংশ হতে পারলে মানুষের জন্য আরও ভালোভাবে কাজের সুযোগ পাবো।’
রেহানা আক্তার রানু বলেন, সংসদে যেতে হলে প্রধানত কথা বলতে হবে, কথা বলতে পারতে হবে। নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে এবার বিএনপি মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সাবরিনা শুভ্রা বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অবদান ও ত্যাগকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যারা মাঠপর্যায়ে আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। পাশাপাশি প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সংসদে কার্যকরভাবে কথা বলার ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া বা প্রান্তিক নারীদের সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন বলে মনে করি। এছাড়া প্রার্থীর সততা, সুনাম, সামাজিক কাজের অভিজ্ঞতা ও দলীয় গ্রহণযোগ্যতা থাকা উচিত—যাতে তারা সংসদে গিয়ে সত্যিকার অর্থে জনগণ ও নারীদের স্বার্থ তুলে ধরতে পারেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী বাছাই ও চূড়ান্ত করবে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। আমি দলের চেয়ারম্যানের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলতে পারি—তিনি সময়োপযোগী সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে যোগ্যদের বাছাই করবেন।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, তৃণমূলের ত্যাগী নেত্রী, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক অবদান, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে জটিল এক সমীকরণ সামনে রেখে চূড়ান্ত করা হবে ৩৬ জনের তালিকা। শেষ পর্যন্ত কারা দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পান এখন সেটিই দেখার পালা।
এসএন/পিডিকে