ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়ার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দিনাজপুর-৬ (বিরামপুর–নবাবগঞ্জ–ঘোড়াঘাট–হাকিমপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শিবলী সাদিকে স্ত্রী খাদিজা মল্লিক শিমু ওরফে শিমলা।
গতকাল সোমবার (৩০ মার্চ) বিকেলে বাবার বাড়ি দিনাজপুরের হাকিমপুর শহরে অবস্থানকালে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন করলে অসুস্থ হয়ে পড়েন শিমু। পরে স্বজনেরা রাত আটটার দিকে তাঁকে দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
খাদিজার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। দাম্পত্য জীবনে চলমান টানাপোড়েনের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঘুমের ওষুধ সেবন করতেন। তবে সোমবার তিনি মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবন করায় অসুস্থ হয়ে পড়েন।
জানা যায়, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময় থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন শিবলী সাদিক। এরপর থেকেই তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খাদিজা মল্লিক হাকিমপুর উপজেলা শহরের সিপি রোড এলাকায় বাবু মল্লিকের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সোমবার সন্ধ্যায় জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের আইসিইউর সামনে শিবলী সাদিকের মা–সহ নিকটাত্মীয়দের ভিড় করতে দেখা যায়।
খাদিজা মল্লিকের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের কর্তব্যরত চিকিৎসক মুসা আল আশারী বলেন, রাত সোয়া আটটার দিকে তাঁকে এখানে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি আইসিইউতে আছেন। চিকিৎসা চলছে এবং তিনি এখন স্ট্যাবল অবস্থায় রয়েছেন।
নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিন্টু দে বলেন, পারিবারিক কলহ থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে জানতে পেরেছি। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার বিকাল ৫টা ৪৬ মিনিটে আত্মহত্যার চেষ্টার আগে খাদিজা মল্লিক সিমু নিজের ফেসবুক পেজ ‘খাদিজা শিমু’-তে একটি আবেগঘন ও চাঞ্চল্যকর স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসে তিনি দীর্ঘ সাত বছরের দাম্পত্য জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে লেখেন, বিয়ের মাত্র দুই থেকে তিন মাস পর থেকেই তিনি নির্যাতন ও অন্যায়ের শিকার হয়ে আসছেন।
খাদিজা শিমু লেখেন, আমি যথেষ্ট স্ট্রং ছিলাম! আল্লাহর প্রতি আমার অনেক ভরসা রয়েছে! কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্রামের প্রয়োজন। দীর্ঘ ৭ বছর ধরে আমার সঙ্গে হওয়া অন্যায় জুলুম আমি আর নিতে পারছি না। এই জীবন এভাবে চলতে পারে না। বিয়ের ২ থেতে ৩ মাস পর থেকে এসব সহ্য করতে করতে আমি আজ ক্লান্ত, আমি শান্তিতে ঘুমাতে চাই।
নিজের এই চরম পরিণতির জন্য খাদিজা সরাসরি স্বামী শিবলী সাদিক, তার কথিত বান্ধবী ববি ইসলাম এবং শামীমসহ আরও কয়েকজনকে দায়ী করেন। স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, আমি যদি হেরে যাই, আমার হয়ে তোমরা তো সব জানো, সব প্রমাণ তোমাদের কাছেও আছে। তোমরা শিবলী সাদিককে ছেড়ো না। আমার সঙ্গে হওয়া অন্যায় আমি আর মানতে পারছি না। কেউ যদি আমাকে ভালো না বাসে, আমি সেই ধরনের মেয়ে না যে তার কাছে ভালোবাসা ভিক্ষে চাইব। কিন্তু আমার সাত বছরের এফোর্টকে শিবলী বলেছে— সে নাকি মন থেকে কিছু করেনি, যা করেছে সেটা তার দায়িত্ব। তিনি শিবলী সাদিককে একজন ‘নার্সিসিস্ট’ বা আত্মকেন্দ্রিক মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, তিনি কৌশলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারদর্শী।
স্ট্যাটাসে ববি ইসলাম নামের এক নারীর সঙ্গে শিবলী সাদিকের অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ তোলেন খাদিজা। তাঁর দাবি, ওই নারীকে বিরামপুর মহিলা কলেজের পেছনে বাড়ি করে দেওয়া হয় এবং বিদেশে পালাতে শিবলী সহায়তা করেন।
এছাড়া, নিজের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও প্রচেষ্টাকে কেবল ‘দায়িত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে উল্লেখ করেন। এমনকি তাঁদের কন্যা স্নেহার জীবন নষ্ট হওয়ার পেছনেও স্বামীর দায় রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে খাদিজা লেখেন, তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভুল হলেও প্রভাবশালী স্বামীর অর্থ ও ক্ষমতার কাছে ন্যায়বিচার পাবেন না বলেই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। একই সঙ্গে শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি তাঁর অনুরোধ—তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিচার যেন নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজনীয় সব প্রমাণ তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে শিবলী সাদিকের সঙ্গে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী আক্তার সালমার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও বনিবনা না হওয়ায় উভয় পরিবারের উপস্থিতিতে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সমঝোতার মাধ্যমে ২০১৬ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। পরে ২০১৯ সালে খাদিজা মল্লিকের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শিবলী সাদিক।