জনস্বার্থে প্রাণী অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার।
আজ রোববার (১২ এপ্রিল) ডাকযোগে ও ই-মেইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে এই নোটিশ পাঠানো হয়।
নোটিশে বাগেরহাটে কুকুর হত্যার সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আগামী তিন দিনের মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নোটিশে উল্লিখিত ২১ দফা সুপারিশ ৩০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায়, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে বলা হয়, দেশে প্রাণীর ওপর নির্যাতন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগল থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণী পর্যন্ত নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এ ধরনের নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, সমাজে প্রাণীকে এখনও ‘জীব’ হিসেবে নয়, ‘বস্তু’ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে, যা এই সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। শিশুদের মধ্যে প্রাণীর প্রতি সহানুভূতির অভাব ভবিষ্যতে সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও এতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক বাগেরহাটের ঘটনার প্রসঙ্গে নোটিশে বলা হয়, খান জাহান আলীর (রহ.) মাজার এলাকায় একটি জীবন্ত কুকুরকে কুমিরের মুখে ফেলে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে সেখানে জীবন্ত প্রাণী কুমিরের খাদ্য হিসেবে নিক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
নোটিশে ‘প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯’ অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ও যন্ত্রণাদায়ক হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে আইন প্রয়োগের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারার কথাও তুলে ধরা হয়, যেখানে গৃহপালিত প্রাণী হত্যা বা পঙ্গু করার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। সংবিধানের আলোকে জীবনের সুরক্ষা ও পরিবেশ রক্ষার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া নোটিশে ২১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রাণী নির্যাতন রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও শাস্তি বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, প্রাণী খাদ্য আমদানি ও পোষা প্রাণী বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে কর-শুল্ক প্রত্যাহার, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে প্রাণীর জন্য কবরস্থানের ব্যবস্থা, সরকারি পশু হাসপাতালে বিনামূল্যে টিকাদান ও ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু, স্বতন্ত্র ‘অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অথরিটি’ গঠন এবং বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন।
এ ছাড়া প্রাণী বিক্রয়কেন্দ্র, পেট শপ ও সেল্টার হোমের লাইসেন্সিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, সিসিটিভি বাধ্যতামূলক করা, প্রাণি সুরক্ষা ইউনিট গঠন, ২৪ ঘণ্টা হটলাইন ও রেসকিউ টিম চালু, প্রাণী নির্যাতনকে আমলযোগ্য অপরাধ ঘোষণা, উপজেলা পর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবা সম্প্রসারণ, পোষা প্রাণির ডিজিটাল নিবন্ধন ও মাইক্রোচিপ ব্যবস্থা চালু এবং শিক্ষাক্রমে প্রাণিকল্যাণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, প্রাণী সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, পরিবেশ রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।