পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতে উদ্বিগ্ন সীমান্তবর্তী মানুষ

সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা আফগান নাগরিক এবং দুই দেশের সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ের আশপাশে থাকা বাসিন্দারা প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘাতের আশঙ্কায় ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সীমান্ত এলাকার পাহাড়ের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়ানো ধোঁয়ার কুণ্ডলী তাদের উদ্বেগকে জীবনের নিরাপত্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

সাংবাদিকরা তোরখাম সীমান্তে কামানের গোলা ও গুলির শব্দ শুনেছেন। এছাড়া, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতের বেলায় আফগানিস্তানে পাকিস্তানের ব্যাপক বোমাবর্ষণের পর আফগান সেনাদের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেছে। গত কয়েক মাসের ছোটখাটো সংঘাতের ঘটনার পর বর্তমান পরিস্থিতিকে বড় ধরনের উত্তেজনা ছড়ানোর আভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আফগানিস্তানের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাতভর চলা লড়াইয়ের সময় পাকিস্তান থেকে সদ্য ফিরে আসা আফগান শরণার্থীদের একটি ক্যাম্পে গোলা আঘাত হানে। এতে একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

গান্দার খান নামে ৬৫ বছর বয়সী এক প্রত্যাবাসনকারী সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছিল। আমি রক্ত দেখেছি। দুই-তিনজন শিশু এবং দুই-তিনজন নারী এতে আহত হয়েছে।’

গত অক্টোবর থেকে প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে লড়াই চলায় স্থল সীমান্ত মূলত বন্ধ থাকলেও, পাকিস্তান থেকে গণহারে ফিরে আসা আফগানদের জন্য তোরখাম ক্রসিংটি খোলা রাখা হয়েছিল। নানগারহার প্রদেশের কর্মকর্তা কুরেশি বদলুন জানান, ক্রসিংয়ের কাছে অবস্থিত ‘ওমারি ক্যাম্প’—যেখানে ফিরে আসা আফগানদের রাখা হয়—সেখানে রাতে একটি মর্টার শেল আঘাত হেনেছে।

৪৪ বছর বয়সী জারঘোন জানান, হামলার পর দুই-তিনটি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেকে তাদের কাগজপত্র ফেলে পালিয়ে গেছে। তারা এমনকি তাদের টাকা বা ত্রাণস সামগ্রীও সাথে নিতে পারেনি। ভয়ে সবাই সবকিছু ফেলে চলে গেছে।’

প্রাদেশিক রাজধানী জালালাবাদে এএফপি-র একজন আলোকচিত্রী ওমারি ক্যাম্পে আহত বেশ কয়েকজন নারীকে চিকিৎসা নিতে দেখেছেন। নানগারহারের জনস্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র নকিবুল্লাহ রাহিমি জানান, ৯ জন নারী ও ৫ জন পুরুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আহতদের মধ্যে এক নারী হাসপাতালে আনার পর মারা গেছেন।

‘চরম দুর্ভোগ’

সহিংসতার পর সীমান্তের কাছে ফিরে আসা আফগানদের খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতে দেখা গেছে। তালেবান কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে পাকিস্তানের চালানো প্রাণঘাতী বিমান হামলার পাল্টা জবাব দিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আফগান বাহিনী স্থল অভিযান শুরু করে।

সীমান্তে এই লড়াই ছড়িয়ে পড়ার পরপরই পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর কান্দাহারে বিমান হামলা চালায়।

তোরখাম সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াকাস শিনওয়ারি দূর থেকে ছোড়া গোলার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি ও সমঝোতা হওয়া উচিত, কারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছে।’

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত ওমারি ক্যাম্পে তাদের কার্যক্রম ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ করেছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, গত রাতে মর্টার আঘাত হানার খবর… ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সংযম এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফগান প্রত্যাবাসনকারীরা সীমান্ত পার হতে পারছেন, তবে সামগ্রিকভাবে সীমান্ত বন্ধ থাকায় তোরখাম এলাকার বাসিন্দারা চরম ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

মুহাম্মদ করিম নামে এক ব্যক্তি বলেন, তিনি এবং তার প্রতিবেশীরা এই সীমান্তের ওপর ভিত্তি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি আরও বলেন, ‘যদি সীমান্তে শান্তি থাকে, তবেই আমরা বাঁচতে পারব। কিন্তু যদি শান্তি না থাকে, তবে আমরা এই এলাকা ছেড়ে চলে যাব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *