চৈত্রের খরার কবলে পড়ে তিতাস নদীর মাঝখানে ভেসে উঠেছে ডুবোচর। এতে কমেছে নদীর পানির স্বাভাবিক স্রোতধারা। মাঝ নদীতে কচুরিপানার স্তূপ জমে সংকোচিত হয়েছে নৌপথ। এতে নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে তিতাসের বুকে ভরা যৌবন নেমে আসে। নৌযানগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য হয় জমজমাট। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি পুরো ভিন্ন।
সরেজমিনে শহরের কাছে ভাদুঘর অংশে গিয়ে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে ধানের আবাদ করা হচ্ছে। নদীর ডুবোচরের কারণে পানির অভাবে ছোট ও মাঝারি আকারের নৌকাগুলো অচলাবস্থায় পড়ে আছে। অলস সময়ে মাঝি-মাল্লারা নৌযানগুলোকে মেরামত করে নিচ্ছেন। নদীতের পানি এবং মাছের আকাল দেখা দেয়ায় তিতাস পাড়ের জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকায় এসেছে পরিবর্তন। ক্ষোভ আর একবুক কষ্ট নিয়ে তিতাস পাড়ের বাসিন্দারা তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।
নদীর মাঝ চরে বসে নৌকা মেরামত করছিলেন দুলাল সূত্রধর; তিনি বলেন, ‘আমি যে জায়গায় বসে কাজ করছি এটা হলো নদীর মাঝখান। নদী শুকিয়ে গেছে। শুকানোর কারণে পানি আসে না। আমাদেরও কাজে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নদীটা যদি খনন করা হতো, বড় করা হতো, তাহলে আমাদের গ্রামের মানুষদের উপকার হতো।’
দুলাল সূত্রধর আরও বলেন, ‘নদীতে এখন মাছ নেই। তাই জেলেরা এখন অন্য কাজ করে ভাত খান। জেলেরা খুব কষ্টে আছেন।’
এ বিষয়ে জেলে পরিবারের সদস্য শিবুদাস বলেন, ‘বর্তমানে আমি নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। নদীটা যদি একটু বড় হতো তাহলে নদীর কচুরিপানাগুলো সহজে চলাচল করতে পারতো। আমাদেরও মাছ ধরতে একটু সুবিধা হতো। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, এই নদীটাকে খনন করে আরেকটু বড় করে দেয়া হোক। কচুরিপানার কারণে আমাদের মাছ ধরতে অনেক সমস্যা হয়। আর এই নদীতে পানি বেশি থাকলে মাছ ধরতে ও নৌকা নিয়ে চলাচল করতে সুবিধা হতো।’
কৃষক নোয়াব মিয়া বলেন, ‘নদীর ফেনার কারণে আমরা পাড় হতে পারি না। বিলের পাড়ের ধান আনতে পারি না। যদি নদীটা কাটানো হয়, তাহলে দূষিত ফেনাগুলো থাকবে না। আর তখন আমরা এলাকাবাসী বিলের পাড়ের ধান বাড়িতে আনতে পারবো।’

মোশারফ মিয়া নামে অপর এক কৃষক বলেন, ‘এই নদীটা নিয়ে আমরা খুবই বিপদে আছি। আমাদের জমিজমা তিতাসের পূর্বপাড়ে। নদীতে পানি কম থাকায় আমরা কৃষকরা ধান কেটে ঘরে আনতে পারি না। আমরা গ্রামবাসী নদীটা নিয়ে খুবই বিপদে আছি, দূষিত ফেনার কারণে।’
নদীকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী শামীম মিয়া বলেন, ‘আমারা তিতাস নদীর ফেনাগুলোর জন্য নৌকা চালাতে পারছি না। বর্ষার জন্য অপেক্ষ করতে হচ্ছে। নৌকাগুলো অলস সময় পাড় করছে। নৌ-পথে খরচ কম। এই নদীটা যদি কাটানো হয়, তাহলে আমাদের খুব উপকার হবে।’
নদী ও প্রকৃতির সংগঠন ‘তরী’ বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের জন্য আন্দোলন করছি। এই তিতাস নদীকে রক্ষা করতে গেলে নদীটি খনন করতে হবে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা জেলা প্রশাসককে বলেছি নদীর কচুরিপানা কাটার জন্য মেশিনের ব্যবস্থা করতে। যেকোনো প্রক্রিয়ায় হোক নদীটিকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের এখানকার জেলেরা, মাঝি-মাল্লাসহ নদীর তীরের মানুষগুলো। আমাদের যে প্রধান কৃষিকাজ এই কৃষি কাজে প্রধান সহায়ক হচ্ছে এই নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলো। নদীতে পানি না থাকায় খালগুলো শুকিয়ে গেছে। নদী নালা, খাল, বিল শুকিয়ে যাওয়ায় জেলেরা পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছে।’
শামীম আহমেদ বলেন, ‘নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলোকে অবশ্যই খনন করতে হবে। নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। সেইসঙ্গে কৃষির সঙ্গে যুক্ত খালগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নদীকে সুরক্ষা না দেয়া গেলে খালগুলোকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। নদীর সঙ্গে খালের যোগাযোগটা সমানতালে নিশ্চিত করতে হবে।’
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত বলেন, ‘কৃষকদের সেচ কাজের সুবিধার্থে গত বছরের জুনে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা খরচ করে তিতাস নদীর বিভিন্ন অংশের ৯২ কিলোমিটার নদী খনন করা হয়েছে। তিতাসের নৌ-পথগুলো উদ্ধারের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে প্রস্তাবনা চাইলে আমরা সেটা তৈরি করে পাঠাতে পারবো।
সম্প্রতি তিতাস নদীর ভাদুঘর অংশ পরিদর্শন করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমির আক্তার জাহান। এ সময় তিনি সময় সংবাদকে বলেন, ‘নদী খননের কাজটা পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিসি যৌথভাবে করবে। তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা প্রজেক্ট তৈরি করে প্রস্তাব আকারে এস্টিমেটসহ আমার কাছে জমা দেবে। তারপর আমরা এই প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেবো। প্রয়োজনে সংসদ সদস্যের সঙ্গে যদি আলোচনার প্রয়োজন হয়, মন্ত্রী সভায় যদি আলোচনার প্রয়োজন হয়, ওনারা একটু যোগাযোগ করবেন। আমি আমার তরফ থেকে যোগাযোগ করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইনশাল্লাহ এই ননী খনন কাজে আমরা সফল হবো। আমি আসার পর থেকেই এ নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি।’
তিতাস নদীটি জেলার নাসিরনগর মেঘনা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে জেলায় ৭টি উপজেলার ১৩০ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে আবারো নবীনগর প্রান্ত দিয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে।