দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধ : জ্বালানিতে সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে পড়তে পারে বাংলাদেশ

পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থল ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির ৯০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলার জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি প্রায় এক মাস ধরে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। 

এই সংকটের মুখে আমদানি নির্ভর দেশগুলোতে এখন জ্বালানির মজুত শেষ হওয়ার পথে, যার মধ্যে এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবার আগে মারাত্মক জ্বালানি শূন্যতার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

৩৩ বছর বয়সী আজিদ আলী একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। যিনি প্রতিদিন কাজের জন্য ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় তার মতো লাখ লাখ মানুষ এখন পাম্পের সামনে দিনরাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। দুই ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করার পর আজিদ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘মোটরসাইকেলই আমার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম, কিন্তু অকটেন না পেলে আমি চলব কীভাবে?’

আজিদ আলী নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন, কারণ তিনি শেষ পর্যন্ত জ্বালানি পেয়েছেন। তবে তার পেছনের অনেক চালককেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। কেননা, পেট্রোল পাম্পের তেল ফুরিয়ে গিয়েছিল।

বর্তমানে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে গাড়ির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। মূলত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করে থাকে।

জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ চরম সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি রেশনিং করেছে, ডিজেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাড়তি ছুটি ঘোষণা করেছে।

এখনো তেলের জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রাম এলাকায় প্লাস্টিকের বোতলে চড়া দামে তেল বিক্রি হচ্ছে।

নতুন সরকার এই সংকট মোকাবিলায় মরিয়া

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বর্তমান সরকারের একজন কর্মকর্তা ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’কে বলেন, বর্তমানে দেশে ১০ দিনেরও কম সময়ের জ্বালানি মজুত আছে। গত মাসের শেষে অপরিশোধিত তেল ছিল মাত্র ৮০ হাজার টন, যা দিয়ে বড়জোর দুই সপ্তাহ চলা সম্ভব। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানির চেষ্টা চলছে। এছাড়া রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় চেয়েছে বাংলাদেশ।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ব্যয়বহুল ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি কিনছে। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব জ্বালানি সংস্থা পেট্রোবাংলা গত ১ মার্চের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি দামে দুটি এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করেছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর বাড়তি খরচের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেছেন, দেশে কোনো ঘাটতি নেই ও সরবরাহ গত বছরের চেয়ে বেশি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসাধু সিন্ডিকেট তেল আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।

বৈশ্বিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেছেন, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার কারণে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শফিকুল আলমের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে পারে। তিনি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।

সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তিন মাসের একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি আমদানির জন্য আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি অর্থায়ন খুঁজছে দেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের এখন দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *