ঢাকা-৯: শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচারণায় প্রার্থীরা

ঢাকা-৯ আসন—খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা নিয়ে গঠিত রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকা। ইতিহাস, সংগঠন ও রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বরাবরই এ আসনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখে জামায়াতে ইসলামী। তবে এবারের নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে প্রার্থী পরিবর্তন এবং জোটগত সমীকরণে এই আসনের চিত্র হয়ে উঠেছে জটিল ও বহুমাত্রিক।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নায়েবে আমীর মরহুম আব্বাস আলী খান এই আসন (তৎকালীন ঢাকা-৮) থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।

যদিও তিনি বিজয়ী হতে পারেননি, তবুও এরপর থেকেই সবুজবাগ-মতিঝিল-কেন্দ্রিক এই এলাকা জামায়াতের কাছে ঐতিহাসিক ও সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে নির্বাচনী এলাকা পুনর্গঠিত হয়ে বর্তমানে ঢাকা-৯ নামে পরিচিত হলেও জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি এখানে এখনও শক্তিশালী বলে দলটির নেতাকর্মীরা দাবি করেন। 

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নির্বাচনের আলোচনা শুরু হলে ঢাকা-৯ আসনে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ ‘জুলাই যোদ্ধা’ ডা. তাসনিম জারাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। খিলগাঁও এলাকায় পড়াশোনা, আত্মীয়স্বজনের বসবাস এবং আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে স্থানীয়ভাবে তার প্রতি সমর্থনও তৈরি হয়।

তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গিয়ে ডা. তাসনিম জারা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ান। 

dhaka-9

এদিকে ডা. জারা সরে যাওয়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় স্থানীয় নেতা কবির আহমেদকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়—এমনটাই জানিয়েছেন একাধিক স্থানীয় নেতা। এর পরবর্তী দুই মাস ধরে খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। জামায়াতের রোকন, কর্মী ও সাথীসহ প্রায় ৪১ হাজার নারী-পুরুষ সংগঠিতভাবে মাঠে নামেন।

ঘরে ঘরে গিয়ে দাঁড়িপাল্লা ও কবির আহমেদের পক্ষে ভোট চাওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষায়, সে সময় প্রচারণার গতি ছিল ‘একশ মাইল বেগে’। 

কিন্তু হঠাৎ করেই রাজনৈতিক মোড় ঘুরে যায়। জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় ১১ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে এই আসনটি জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ছেড়ে দেওয়ার। ফলে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয় মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া রাসিনকে।

এতে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দীর্ঘদিন মাঠে থাকা কবির আহমেদ সরে দাঁড়ানোয় প্রচারণার গতি কিছুটা কমে আসে। 

তবে সংগঠনের শৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করে ঢাকা-৯ আসনের নির্বাচনী কমিটির সদস্য সচিব ও বর্ষীয়ান জামায়াত নেতা মো. শাহজাহান বলেন, “কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনেই সবাই এখন এনসিপির প্রার্থী জাবেদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।” তিনি জানান, এই আসনে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৬৯ হাজার, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ। স্থানীয় জামায়াতের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ব্যক্তিগতভাবে হাবিবুর রশিদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযোগ নেই এবং তিনি ‘ক্লিন ইমেজের’ প্রার্থী হিসেবেই পরিচিত। প্রচারণার সময় জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের নজিরও দেখা গেছে। একাধিকবার কবির আহমেদ ও হাবিবুর রশিদের মুখোমুখি সাক্ষাতে কোলাকুলির ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে।

dhaka 9

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা পুরো এলাকায় নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছেন। মাইক ব্যবহার না করে, সীমিত সংখ্যক সমর্থক নিয়ে গণসংযোগ চালিয়ে তিনি তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিমত। ভোটারদের একটি অংশ তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও দেখছেন।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার হারুনুর রশিদ বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে এখন পর্যন্ত কোনো হট্টগোল, সহিংসতা বা অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তিনটি থানায় কোনো জিডিও দায়ের হয়নি এবং নির্বাচন কমিশনের ভ্রাম্যমাণ টিম মাঠে সক্রিয় রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি, নারী ভোটার প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৫ জন।

সব মিলিয়ে ঢাকা-৯ আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিযোগিতাই নয়, বরং জোট রাজনীতি, স্থানীয় প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার এক জটিল সমীকরণ। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কাকে বেছে নেবেন—তা জানতে অপেক্ষা এখন ভোটের দিনের।