জান্তাপ্রধান থেকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হলেন মিন অং হ্লাইং

মিয়ানমারের সামরিকপন্থী আইনপ্রণেতারা শুক্রবার (৩ এপ্রিল) জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এর মাধ্যমে সাবেক এই সেনাপ্রধান পাঁচ বছর আগে জোর করে ক্ষমতা দখলের পর এখন বেসামরিক মোড়কে তার শাসনকাল বজায় রাখতে যাচ্ছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

অভ্যুত্থানকারী এই জেনারেল ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন। এ ঘটনা দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। এই সংঘাত এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

আজ শুক্রবার মিয়ানমারের পার্লামেন্ট স্পিকার অং লিন দ্বে ঘোষণা করেন, মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। জান্তার তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী সামরিকপন্থী সংসদ সদস্যরা তাকে এই পদে বেছে নেন।

রাজধানী নেপিদোতে শুক্রবার পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্নকক্ষে পড়া মোট ৫৮৪টি ভোটের মধ্যে মিন অং হ্লাইং ৪২৯টি ভোট পেয়েছেন বলে একজন সংসদীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

দেশটির সামরিক জান্তা সরকার গত মাসে পুনরায় পার্লামেন্ট চালু হওয়াকে জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হিসেবে প্রচার করলেও, বিশ্লেষকরা একে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি ‘বেসামরিক লোকদেখানো আয়োজন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইয়াঙ্গুনের ৫০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বলেন, ‘তার (মিন অং হ্লাইং) প্রেসিডেন্সির অধীনে দেশের কোনো আশা নেই। দেশের অবস্থা কেবল আরও খারাপ হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি এই সরকারের কাছ থেকে কখনোই কিছু আশা করিনি, কারণ এটি একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে।’

জানুয়ারিতে শেষ হওয়া ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সামরিকপন্থী দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ৮০ শতাংশের বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান সদস্যরাও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মোট আসনের এক-চতুর্থাংশ দখল করে আছেন নিয়ম অনুযায়ী।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর থেকে জনপ্রিয় নেত্রী অং সান সু চি আটক রয়েছেন। তার দলকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, নির্বাচনের সমালোচনা বা প্রতিবাদকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। এই নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ভোটদান স্থগিত রাখা হয়েছিল।

নির্বাচনের পরেও বিরোধী গোষ্ঠীগুলো অনড় অবস্থানে থাকায় চলমান সংঘাত এবং মানবিক সংকট থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মানবাধিকার সংগঠন ‘বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে’ বলেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কখনোই সংস্কার হবে না। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘সামরিক বাহিনী কেবল টিকে থাকার জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধরন বদলায় এবং দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ কমাতে কৌশল পরিবর্তন করে।’

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক কমান্ডকে বেসামরিক পোশাকে আবৃত করার এই সিদ্ধান্তটি কিছু আঞ্চলিক অংশীদার দেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া এবং বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দেবে।

জান্তার অন্যতম প্রধান মিত্র চীন শুক্রবার মিন অং হ্লাইংকে তার নির্বাচনি বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে উচ্চ-মানের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সাংবাদিকদের বলেন, ‘চীন মিয়ানমারের নতুন সরকারকে জাতীয় শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে সমর্থন জানায়।’

আশা করা হচ্ছে যে, মিন অং হ্লাইং আগামী সপ্তাহে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী জরুরি অবস্থার শাসনামলে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট—উভয় দায়িত্বই পালন করেছেন। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করতে তাকে সামরিক পদ ত্যাগ করতে হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায়, গত সোমবার মিন অং হ্লাইং তার অনুগত এবং সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়ে উইন ও-এর কাছে সামরিক নেতৃত্বের ব্যাটন হস্তান্তর করেন।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ধরেই এই অশান্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটিকে শাসন করেছে এবং নিজেদেরকে দেশের ভাঙন ও ধ্বংস রোধকারী একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া এক দশকের গণতান্ত্রিক বিরতির সময় জেনারেলরা তাদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করেছিলেন, যা অং সান সু চি-কে বেসামরিক নেত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসতে এবং দীর্ঘদিনের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়ে সংস্কারের পথে দেশ পরিচালনা করতে সাহায্য করেছিল।

তবে ২০২০ সালের নির্বাচনে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সু চি-র দল সামরিকপন্থী ইউএসডিপি-কে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করলে, মিন অং হ্লাইং ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ক্ষমতা দখল করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলো ছিল ভিত্তিহীন এবং সশস্ত্র বাহিনীর ক্রমহ্রাসমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণেই তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

যেহেতু বর্তমানে পার্লামেন্টে ইউএসডিপি জেঁকে বসেছে এবং তাদের পেছনে অনির্বাচিত সামরিক আইনপ্রণেতাদের সমর্থন রয়েছে, তাই ধারণা করা হচ্ছে, নতুন সরকার সম্পূর্ণভাবে সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনেই চলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *