এম তাহের এ সাইফ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা শ্যাম্পেইনের অধ্যাপক। গত ডিসেম্বরে ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।
একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। কয়েক বছর আগে ধানমন্ডি ১ নম্বর রোড ধরে আমি গাড়ি করে যাচ্ছিলাম। প্রচণ্ড যানজট। গরম। এমন সময়ে একটা ছোট্ট মেয়ে আমার চোখে পড়ল। টিস্যু পেপার বিক্রি করছিল। ৬-৭ বছর বয়স হবে। মেয়েটাকে খুব ক্লান্ত ও বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ওকে ডেকে জানতে চাইলাম, তুমি কী করো? বলল, ‘টিস্যু বিক্রি করে যা আয় হয়, পরিবারকে দিই।’
মনটা খুব খারাপ হলো। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্কুলে যাও?’ প্রশ্ন শুনেই ওর চোখমুখ ঝলমল করে উঠল। বলল, ‘আমি প্রতি শুক্রবার দুই ঘণ্টার জন্য স্কুলে যাই।’ বুঝলাম, শুক্রবারের ওই দুই ঘণ্টাই ওর জীবনে আনন্দের উৎস। এই গল্প যুক্তরাষ্ট্রে আমি আমার অনেক ছাত্রছাত্রীকেই বলেছি।
জানি না সেই ছোট্ট মেয়েটা এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। সে কি কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখে? প্রকৌশলী, আইনজীবী, চিকিৎসক বা ইতিহাসবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখে? স্বপ্ন সত্যি করার মতো সৌভাগ্য কি ওর কখনো হবে, যেমনটা আজ তোমাদের হলো? আজ তোমরা যে মাইলফলক অতিক্রম করলে, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এটা একটা অধরা স্বপ্ন।
আজকের অর্জন শুধু তোমার কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতারই ফসল নয়। এর পেছনে তোমার মা-বাবার অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। আজ যখন পেশাজীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, মনে রেখো মা-বাবাই আজীবন তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে থাকবেন। তাঁরা তোমার কাছে কিছুই চান না, শুধু তোমার ভালো চান।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, যদি আমার ছেলেবেলায় ফিরে যেতে পারতাম। যদি সেই শিক্ষকের কাছে যেতে পারতাম, যিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, কীভাবে কয়েকটা বর্ণ এক করে একটা শব্দ লিখতে হয়। ক্লাসরুমে যাঁরা তোমাকে পড়িয়েছেন, তাঁরাই আদতে ক্লাসরুমের বাইরে পা রাখার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি, ব্যবসা, বহু কিছু তুমি শিখেছ। এখন তুমি বাংলাদেশ বা সারা পৃথিবীর সমস্যা সমাধান করতে প্রস্তুত। তোমার এই শিক্ষা চলমান থাকবে। যা-ই করো, মনপ্রাণ দিয়ে করো। যেটা করছ, সেটাতেই সেরা হওয়ার চেষ্টা করো।
নম্রতা হোক তোমার সঙ্গী, সহানুভূতি হোক তোমার পথপ্রদর্শক। এই দুই গুণই তোমার এবং তোমার আশপাশের মানুষের জীবনকে সুখী, সমৃদ্ধ করবে। সব সময় নীতির পথটাই বেছে নিয়ো। এই পথ তোমাকে অহংয়ের ফাঁদ থেকে রক্ষা করবে।
আজ প্রাথমিক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে সনদ দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তো কেবল গবেষণা ও জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়। ন্যায় ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর দীক্ষাও আমরা পাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ইতিহাসে আমরা বারবার এর প্রমাণ পেয়েছি। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আজও শিক্ষার্থীদের অনেক আন্দোলন আমাদের সমাজকে বদলে দিয়েছে, উন্নত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীরা ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। কিছুদিন আগে গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধেও সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছিল। সুতরাং শুধু চাকরিতে থিতু হয়ে যেয়ো না। স্রেফ একজন প্রকৌশলী, একজন ব্যবসায়ী বা একজন অর্থনীতিবিদের জীবন বেছে নিয়ো না। তোমার আশপাশের পৃথিবীর ব্যাপারেও সচেতন থেকো। যদি তারুণ্য ধরে রাখতে পারো, তাহলে পৃথিবীকে পরিষ্কার চোখে, নির্ভীক মনে দেখতে পারবে। তুমিই তো আমাদের কালের বিবেক।
তোমরা চাইলে ন্যায় ও সুবিচারের এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে পারো। এমন এক পৃথিবী গড়ে তুলতে পারো, যেখানে আর কোনো শিশুকে প্রচণ্ড গরমে পরিবারের বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘুরতে হবে না। বরং সে স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখতে পারবে, স্বপ্নকে বাস্তব করার সাহস পাবে। আমি এমন একটি পৃথিবী চাই, যেখানে প্রতিদিন মানুষ মরবে না, অনাহারে থাকা মানুষের কাছে পৃথিবীটাকে কোনো উন্মুক্ত কারাগার মনে হবে না। মানুষকে বারবার নিজের ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হবে না।