আমরা সবাই সাধারণত পৃথিবী থেকে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি কিন্তু এই মুহূর্তে কয়েকজন নভোচারী তাদের নভোযানের ভিতর থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছেন। সেখান থেকে তারা তুলেছেন পৃথিবীর বেশ কিছু চমৎকার ছবি। তার মধ্যে একটি ছবি- হ্যালো ওয়ার্ল্ড। কথা বলছিলাম আর্টেমিস-২ মিশনের ওরিয়ন ক্যাপসুলে থাকা নভোচারীদের নিয়ে।
এই একটি ছবি আমাদের ভাবনার জগতকে আরো সম্প্রসারিত করছে। এই একটি ছবিতে আমরা বসবাস করছি প্রায় ৮৩০ কোটি মানুষসহ অন্যান্য জীবজন্তু। এখানেই আমাদের যাবতীয় শ্রম, ভালোবাসা অধ্যাবসায় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এখানেই রয়েছে হিংসা, খুন, যুদ্ধের মতো ভয়ংকর সব বিষয়।
আর্টেমিস-২ মিশনের রকেটটি ১ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হলেও বাংলাদেশ সময় সেটা ২ তারিখ ভোর চারটা হয়ে যায়। এখনো পর্যন্ত সেটি সফলভাবে চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে চলছে। উৎক্ষেপণের পর প্রথম দিন নভোচারীরা একটি হাই আর্থ অর্বিডে প্রবেশ করেন সেখানে ওরিয়নের নেভিগেশন এবং জীবনধারণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
এরপর ৩ এপ্রিল রাতের দিকে নভোচারীরা তাদের নভোযানের ট্রান্স লুনার ইনজেকশন বার্ন করেন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নভোযান তার যাত্রা পথ নির্ধারণ করি এবং পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। এই যাত্রাপথ প্রায় দুই লাখ মাইলেরও বেশি যা ইতোমধ্যে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করেছে। নভোযানটি এখনও পর্যন্ত তেমন কোনো সমস্যায় পড়েনি শুধু উড্ডয়নের পরপরই টয়লেট এর ভ্যাকুয়াম সিস্টেমটি ঠিক মতো কাজ করছিল না, যা পরবর্তীতে ঠিক করা হয়। তবে আজ (৫ এপ্রিল) পুনরায় একই যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পরে। টয়লেটের বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় (ইউরিন কালেকশন ব্যাগ) এটি এই মুহূর্তে বড় কোনো সমস্যা নয়।
ওরিয়ন রোববার ৫ম দিনে চাঁদের গ্রাভিটি বলয়ে প্রবেশ করে, এটি সেই মুহূর্ত যখন চাঁদের মহাকর্ষীয় টান পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। চাঁদের কাছাকাছি আসার পর নভোচারীরা একটি সম্পূর্ণ দিন হাতে পাবেন, যার প্রায় পুরোটাই তাদের স্পেসস্যুটের পরীক্ষায় ব্যয় হবে। এই কমলা রঙের স্যুটগুলো নভোচারীদের সুরক্ষা দেয় এবং জরুরি অবস্থায় ওরিয়নের চাপ কমে গেলে এটি নভোচারীকে ছয়দিন পর্যন্ত শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে।
মহাকাশে নতুন এই স্যুট পরা প্রথম নভোচারী হিসেবে আর্টেমিস ২-এর নভোচারীরা দ্রুত স্যুট পরা, সেই অবস্থায় নিজেদের আসন স্থাপন ও তাতে বসা, স্পেসস্যুটের হেলমেটের একটি পোর্টের মাধ্যমে খাওয়া-দাওয়া করা এবং অন্যান্য কার্যকারিতা পরীক্ষা করবেন। রোববার ৫ম দিনে নাসা একটি ভিডিও প্রকাশ করে। যেখানে নভোচারীদের ব্যায়াম করতে এবং খালি গায়ে কাজ করতেও দেখা যায়।
আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন না। তারা সম্পূর্ণ চাঁদ একবার প্রদক্ষিণ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, নভোযানটিতে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গ্র্যাভিটির সাহায্যে নিয়ে গতি বাড়ানো এবং চাঁদের কাছাকাছি যাওয়ার সময় গ্র্যাভিটির সাহায্যে একবার গতি কমানো এবং পুনরায় গতি বাড়িয়ে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় নভোযানটিকে থ্রার্স্ট ব্যবহার করে গতিপথ ঠিক করে দিতে হবে।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) আর্টেমিস-২ মহাকাশযানটি চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান দিয়ে উড়ে যাবে। এই কাছাকাছিও অবশ্য অনেক দূর, সেটি প্রায় ৪৭০০ মাইল বা ৭৬০০ কিলোমিটার। বর্তমানে এই মিশনের নভোচারীদের বহন করা ক্যাপসুল ওরিয়ন প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে ছুটে চলছে এবং প্রায় একই গতিতে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের প্রবেশ করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১০ই এপ্রিল তা পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ অভিযানের মাধ্যমে প্রথম চাঁদের মাটিতে মানুষের পা পড়ে। তারপর থেকে আজও পর্যন্ত প্রায় ২৪ জন নভোচারী চাঁদের মাটিতে পা রেখেছেন। ১৯৭২ সালে এপোলো-১৭ মিশন এর মাধ্যমে মানুষ সর্বশেষ চাঁদে অবতরণ করেছিল। ফিরে আসি হ্যালো ওয়ার্ল্ড ছবিটি নিয়ে। পৃথিবী থেকে চাঁদের উদ্দেশ্যে যাওয়া নভোযান থেকে এই ছবিটি তোলেন মহাকাশচারী রিড ওয়াইজম্যান।
গত ২ এপ্রিল তোলা ছবিটিতে গভীর নীল আটলান্টিক মহাসাগর, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, মরু অঞ্চলেরাও দেখা যাচ্ছে। এখনো পর্যন্ত এটাই আমাদের একমাত্র বসবাসের জায়গা। তবে ভবিষ্যতে মানুষ সর্বপ্রথম চাঁদেই বসতি স্থাপন করতে যাচ্ছে।