এবারের বইমেলায় খরচ উঠছে না প্রকাশকদের

অমর একুশে বইমেলায় এবার পাঁচ শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা স্টলগুলোতে বইয়ের পসরা সাজিয়েছিল। গল্প, কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি মেলায় এসেছে বিভিন্ন প্রবন্ধের বই। এবারের বইমেলায় ইসলামিক বই ছিল অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। তবে সব মিলিয়ে বইমেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা কম। আর বেচা-বিক্রির অবস্থাও এতটা খারাপ যে, স্টল খারচ উঠবে না, এমনকি বিক্রয়কর্মীদের বেতন দিতে হবে পকেট থেকে। এমনটাই জানিয়েছেন প্রকাশকরা। 

আগামী রবিবার (১৫ মার্চ) শেষ হচ্ছে বইমেলা, শুরু হয়েছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি। শেষ সময় শুক্রবার (১৩ মার্চ) মেলায় গিয়ে দেখা গেছে, বই বিক্রির সংখ্যা সামান্য বাড়লেও ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, এবার নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা এবং বিক্রি আনুপাতিক হারে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে কম। জনসমাগমও তেমন একটা ছিল না।

বাংলা একাডেমির তথ্য মতে, ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় মোট তিন হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের বইমেলায় নতুন বই জমা পড়েছে মাত্র এক হাজার ৩৩৭টি— যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম।

মেলা ঘুরে কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধ্রুপদী বই এবং প্রবন্ধের বইয়ের বিশেষ শ্রেণির পাঠক আছেন, তবে তা খুবই সীমিত। পাঠকরা অনেকেই এসেছেন হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আজাদ, জাফর ইকবালসহ অনেক লেখকের পুরোনো বই কিনতে। আগামী প্রকাশনী থেকে হুমায়ূন আজাদের পুরোনো বই, এবং জাফর ইকবালের বই ভালো বিক্রি হচ্ছে শেষ সময়ে।

প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ সংকলন ‘বিচ্ছিন্নতায় অসম্মতি’র মূলভাব’ বইটি নতুনভাবে বের করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। ২০১৪ সালে এই প্রবন্ধগুলো নিয়ে বই বের করেছিল বিদ্যাপ্রকাশ। পাঞ্জেরী প্রকাশনী জানায়, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বই কিছু বিক্রি হয়েছে। তবে এবারের মেলা থেকে স্টলসহ অন্যান্য খরচ উঠবে না।  

পুথি নিলয় পাকলিকেশন ঘুরে দেখা গেলো, অলস সময় কাটাচ্ছেন কিক্রয়কর্মীরা। বেচা-কিক্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে পুথি নিলয় পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল বলেন, ‘‘যেকোনও সময়ের চেয়ে এবার বইমেলায় বেচা-বিক্রি কম। গতবারের বিক্রির ১০ ভাগের একভাগ এবার বিক্রি হয়েছে। স্টলের বিক্রয়কর্মীর টাকাও উঠবে না এবার। প্রত্যেক প্রকাশকের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেলো, কোনও প্রকাশকেরর স্টল খচর উঠবে না।’’

নতুন বইয়ের সংখ্যা এবার কেমন জানতে চাইলে শ্যামল পাল বলেন, ‘‘নতুন বইয়ের সংখ্যা কম, সবারই কম। আমাদের প্রতি বছর ৫০টির ওপরে থাকে, এবার মাত্র ১৪টি। অন্যান্য প্রকাশকদের অবস্থা আরও খারাপ।’’

নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে অনেকটা জোর করেই এবার মেলা শুরু করেছে বাংলা একাডেমি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার যথা সময়ে বইমেলা শুরু না করে অসময়ে বইমেলা শুরুর উদ্যোগ নেয়। বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের অন্তোষের মুখে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরুর ঘোষণা দেয়। তবে প্রকাশকরা এই সময় বইমেলা করার বিপেক্ষে মত জানান। তাদের দাবি ছিল, ঈদের পর বইমেলা করতে হবে। বাংলা একাডেমি তা মানেনি। শেষে ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলায় একাডেমি বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানায়। বৈঠকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আমার একুশে বইমেলা শুরুর কথা বলা হয়।

বৈঠকের সিদ্ধান্তে আর জানানো হয়, বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। বইমেলায় (২০২৬) অংশগ্রহণকারী যেসব প্রকাশক এর আগে স্টল বরাদ্দ নেননি, তারা ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টার মধ্যে আবেদন করবেন এবং সেই ভিত্তিতে একইদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় তাদের স্টল বরাদ্দ করা হবে।

এরপর ৩৫০ জন প্রকাশক ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি জানান, যারা আগে প্যাভেলিয়ন করেছে, তাদের প্যাভেলিয়ন থাকলে বইমেলায় অংশ নেবেন না। এই পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমি প্যাভেলিয়ন সরানোর নির্দেশনা দেয়। বলা হয়, প্যাভিলিয়ন অপসারণ এবং যারা টাকা জমা দিয়ে স্টল করতে পারেনি, তাদের টাকা ফেরত দেবে।

কলি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন কলি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ১০ শতাংশ বিক্রিও হয়নি। বইমেলায় ব্যাপক পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয়। অথচ আমাদের স্টাফদের যে বেতন-ভাতা সেই বিক্রিও হয়নি।’

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *