একেঅন্যকে দোষারোপে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তা

পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনার শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। আলোচকদের পৌঁছানোর বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি এবং উভয় পক্ষই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে দায়ী করছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগত হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যেটি চুক্তির আওতায় পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, তেহরান লেবাননে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ইরানের দাবি, লেবাননও এই চুক্তির আওতাভুক্ত—যা ওয়াশিংটন অস্বীকার করছে।

এতোকিছু সত্ত্বেও, ইসলামাবাদ এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনার জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই আলোচনায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং প্রণালি দিয়ে অবাধ বাণিজ্যসহ বেশ কিছু সংবেদনশীল বিষয় স্থান পাবে।

ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের ওপর নির্ভর করতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুদ্ধ অবসানের আলোচনা হওয়ার বিষযটি সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর নির্ভরশীল। ইরানি কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, ইসরায়েলি হামলা এই আলোচনাকে ‘অর্থহীন’ করে তুলেছে।

তবুও, ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে তারা কোনো দেশের দিকে কিছু ছুড়ে মারেনি।

এদিকে, বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের বেশ কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এই নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘খুবই নিম্নমানের’ কাজ করছে এবং তারা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং বিশাল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, কিন্তু যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে মাত্র অল্প সংখ্যক জাহাজ এটি অতিক্রম করেছে।

দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল, যাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্তকারী এই সংঘাতের অবসান ঘটে।

নিরাপত্তার খাতিরে শেষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানের বাসিন্দা শায়দা বলেন, ‘আমি আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ভয় পাচ্ছি, আবার একই সঙ্গে এই শাসকগোষ্ঠী থেকে যাওয়ার ব্যাপারেও ভীত।’

আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে তেহরানের পাকিস্তান দূতাবাসের একটি পদক্ষেপ। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ডিলিট করে দেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে সেদিনই একটি ইরানি প্রতিনিধি দল পৌঁছাবে। তবে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, শনিবার (১১ এপ্রেল) মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের, যার সাথে থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় নতুন ফাটল দেখা দেয় যখন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ লেবাননে ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করেন এবং ইসরায়েলকে ‘ক্যান্সার সদৃশ রাষ্ট্র’ ও ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। যদিও কয়েক ঘণ্টা পর পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হয়, তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই মন্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকাকে জটিল করে তুলতে পারে।

সমান্তরাল আলোচনা

শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিবসহ বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলার সাইরেন শোনা গেছে। হিজবুল্লাহ ঘোষণা করেছে যে, তারা সীমান্তের উভয় পাশে ইসরায়েলি বাহিনী এবং উত্তর ইসরায়েলের একটি শহরে ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে।

বুধবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে লেবাননে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালায় ইসরায়েল, যাতে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, ইসরায়েল হামলা হ্রাস করছে এবং নেতানিয়াহু তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে তাদের আক্রমণগুলো এখন থেকে আরও ‘সংযত’ ধরনের হবে।

একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন যে, ‘ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে’ বা কালো বুধবারের পর বৈরুতে পুনরায় বিমান হামলা বন্ধ করতে ইউরোপীয় রাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশ এবং মিশর ইসরায়েলের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে।

ওয়াশিংটন জানিয়েছে, যুদ্ধের লেবানন ফ্রন্টটি আলাদা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা আগামী সপ্তাহে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বৈঠকের আয়োজন করবে।

ইসরায়েল বা লেবানন সরকার কেউই প্রকাশ্যে এই আলোচনার কথা নিশ্চিত করেনি। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার মন্ত্রীদের হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে লেবাননের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথ খোঁজার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই ঘোষণাটি এল। লেবাননের একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় বসার আগে বৈরুত একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি দেখতে চাইবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *