ইরান যুদ্ধ থেকে কী শিক্ষা পেল যুক্তরাষ্ট্র

এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় দেশের অবস্থানের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান থাকায় আলোচনাটি কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। তবে গত দেড় মাসের যুদ্ধ শুধু এই সংঘাত সম্পর্কেই নয়, আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ শিক্ষাগুলো মূল বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে। আলজাজিরায় প্রকাশিত আবদুল্লাহ বন্দর আল-ইতাইবি’র বিশ্লেষণ।

পরিমাপ ও ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ

ইরান এমন এক বিশাল পরিসরের দেশ, যারা যেকোনো সরাসরি যুদ্ধকে তাৎক্ষণিক জটিল করে তোলে। প্রায় ১৬ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারের ভূখণ্ডে ৯ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা রয়েছে। সাম্প্রতিক বড় যুদ্ধগুলো যেসব পরিবেশে সংঘটিত হয়েছে, এই দেশটি তার চেয়েও অনেক বড়। 

তুলনামূলকভাবে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের আক্রমণের শিকার হওয়া ইরাকের ভূখণ্ড ইরানের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং জনসংখ্যাও তাদের অর্ধেক। অপরদিকে আফগানিস্তান ও ইউক্রেন আকারে বড় হলেও ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার দিক থেকে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামরিক অভিযানগুলো রৈখিকভাবে বাড়ে না। বৃহত্তর ভূখণ্ডের জন্য শুধু বেশি সৈন্য ও অস্ত্রই নয়, এজন্য বহুগুণ বেশি রসদ, দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত গোয়েন্দা নজরদারিও প্রয়োজন হয়। যুদ্ধের ব্যাপকতায় যদি পরিকল্পনা জটিল হয়ে পড়ে, তখন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেটি আরও বেড়ে যায়।

ইরাকে নিজেদের অনুকূলে ভূখণ্ডের সুবিধা পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী। তারা তুলনামূলকভাবে দক্ষিণাঞ্চলীয় সমতল মরুভূমি ও নদী উপত্যকা দিয়ে দ্রুত অগ্রসর হতে পেরেছিল, যাতে বাগদাদে দ্রুত অভিযান চালানো সম্ভব হয়। রাশিয়ার বাহিনীও ইউক্রেনের তুলনামূলকভাবে সমতল ভূখণ্ড থেকে সুবিধা পেয়েছিল। দেশটির পূর্বাঞ্চলের স্তেপ অঞ্চল সহজেই অতিক্রম করেছিল রুশ বাহিনী।

সমতল ভূখণ্ডের সমস্যা হলো–এটি সেনাদের শত্রুর আক্রমণের মুখে ফেলে দেয়। কারণ তাদের গতিবিধি সহজেই শনাক্ত করতে পারে হামলাকারীরা। আফগানিস্তানে অবশ্য এক ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর। দেশটির পার্বত্য ভূখণ্ড প্রচলিত অভিযানকে সীমিত করে দিয়েছিল এবং বিমান বাহিনী, বিশেষ বাহিনী ও স্থানীয় মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিল আক্রমণকারীরা। তবে, ইরানে আরও অনেক বড় পরিসরে ভৌগলিক পরিবেশের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হবে আক্রমণকারী বাহিনীর।

জাগ্রোস পর্বতমালা ইরানের পশ্চিম সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত, যা একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক প্রাচীর সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া উত্তরে অবস্থিত আলবোর্জ পর্বতমালা তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ঢাল হিসেবে কাজ করে। মধ্যাঞ্চলে রয়েছে বিস্তীর্ণ মরুভূমি, যা সামরিক মহড়া ও রসদ সরবরাহকে জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর বরাবর ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা সামুদ্রিক দুর্বলতা, কিন্তু সেই সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক সুযোগও তৈরি করে।

ইরানের পার্বত্য ভূখণ্ড স্থলপথে আক্রমণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। পাশাপাশি পার্বত্য ভূখণ্ড ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক (মিসাইল লঞ্চার), সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকেন্দ্র এবং এমনকি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লুকিয়ে রাখার প্রচুর সুযোগ করে দেয়। এর অর্থ দাঁড়ায়, শুধু বিমান হামলায় সীমাবদ্ধ একটি যুদ্ধ বহু মাস ধরে চলতে পারে, কারণ ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।

শক্তিশালী এবং সুসংহত প্রতিরক্ষা

অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য দুর্বলতার কারণ—এই ধারণাটি প্রায় ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত। ইরান জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময়, যেখানে আজারবাইজানি, কুর্দি, আরব, বেলুচ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুরা দেশটির বিশাল জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ। তা ছাড়া ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বহির্গত হুমকি জাতীয় সংহতিকে ভাঙার পরিবর্তে, বরং আরও শক্তিশালী করে তোলে।

ইউক্রেন এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। ভাষাগত ও আঞ্চলিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার আগ্রাসন ইউক্রেনীয় জাতীয় পরিচয় ও প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ইরানেও একই দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। বিদেশি সামরিক চাপ ইরানকে বিলুপ্ত করেনি; বরং তা দেশটিকে আরও সুসংহত করেছে।

ইরানের সামরিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মিলিয়ে দেশটির আট লাখের বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। ইরানের স্তর-বিন্যস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রচলিত ও অপ্রতিসম উভয় প্রকার যুদ্ধের জন্যই পরিকল্পিত। দেশটির নীতিতে বিস্তার, টিকে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইরান ২০০৩ সালের ইরাকের মতো নয়। নিষেধাজ্ঞা ও পূর্ববর্তী যুদ্ধের কারণে ইরাকের সামরিক বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইরান একটি কার্যকর রাষ্ট্রযন্ত্র এবং তাদের সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে, একটি বৃহৎ ও আধুনিক সামরিক বাহিনীও একটি ক্ষুদ্র কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সুসংগঠিত প্রতিরোধ বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।

দ্রুত বিজয় ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আশায় রাশিয়া বিশাল বাহিনী নিয়ে ইউক্রেনে প্রবেশ করে। কিন্তু যুদ্ধটি দ্রুতই একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হয়, যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক এবং কৌশলগত লাভও সীমিত।

প্রচলিত অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা 

প্রচলিত অস্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কেও শিক্ষা নেওয়ার আছে। গত দেড় মাসে দেখা গেছে, আকাশে অপ্রতিরোধ্য শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও তা সবসময় চূড়ান্ত ফলাফলে এনে দেয় না, যদি আক্রমণের শিকার হওয়া দেশটি প্রতিরোধ করতে এবং টিকে থাকতে সক্ষম হয়। ইরানের রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা।

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত ধ্বংস করা যায় এমন উচ্চ-মূল্যের অস্ত্রের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে, ইরান একটি বিকেন্দ্রীভূত ও স্তর-বিন্যস্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। মিসাইল লঞ্চার, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রগুলো পাহাড়ি ভূখণ্ড বা সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোর মধ্যে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে সেগুলোকে শনাক্ত ও নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, ভূগোল কেবল যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নয়; এটি ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে একীভূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ড্রোন ও তুলনামূলক স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপর ইরানের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এক ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নির্ভুলতা বা আধিপত্য অর্জন নয়; সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা এবং চাপ সহ্য করাই মূল কাজ। এ ব্যবস্থা প্রতিপক্ষের ওপর যুদ্ধ পরিচালনগত খরচের বোঝা চাপিয়ে দেয়। এর ফলে প্রতিপক্ষের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। অনেক সস্তা ও সহজে তৈরি করা যায় এমন অস্ত্রের মোকাবিলা করার জন্য তাদেরকে অত্যন্ত অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়। এই ধরনের ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রণক্ষেত্রে দ্রুত বিজয় এনে দেয় না, কিন্তু এটি চূড়ান্ত ফলাফল অর্জনের ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করতে থাকে।

এর ফলে বাস্তবে সামরিক শক্তির কার্যকারিতায় পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রচলিত (বাহিনীর) শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও এর ভূমিকা কিন্তু সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রচলিত শক্তিশালী বাহিনীগুলো বিপর্যস্ত, ধ্বংস এবং প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু ভৌগোলিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সামরিক শক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকা কোনো দেশকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে তারা হিমশিম খায়।

কৌশলগত অর্থ 

ইরান ২০০১ সালের আফগানিস্তান নয়, ২০০৩ সালের ইরাকও নয়, কিংবা ২০২২ সালের ইউক্রেনও নয়। এটি এই তিন দেশের পরিবেশেরই সংমিশ্রণ, যাতে ব্যাপকতা, জটিলতা ও স্থিতিস্থাপকতার সমন্বয় ঘটেছে। ইরান কেবল একটি কঠিনতর লক্ষ্যবস্তুই নয়; এটি যুদ্ধের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। ব্যাপকতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং টিকে থাকার সক্ষমতার সমন্বয়ের কারণে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী, ব্যয়বহুল এবং এর ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রধান শক্তিগুলোর জন্যও এ যুদ্ধের প্রভাব সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৩ সালে ইরাকে দেখা দ্রুত ও চূড়ান্ত অভিযানের প্রত্যাশা ইরানের ক্ষেত্রে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারলেও, তা সহজে সময়কে সংকুচিত করতে বা ফলাফলের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

পরিশেষে, এই সংঘাত আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতিতে একটি ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিজয় এখন আর গতি বা প্রাথমিক আধিপত্য দ্বারা নয়, বরং সহনশীলতা, অভিযোজন ক্ষমতা এবং জটিল পরিবেশে কার্যকরভাবে কাজ করার দক্ষতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। যুদ্ধ পুনরায় শুরু হবে কিনা, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশে এই শিক্ষা একটি প্রধান নির্ধারক হতে পারে।

লেখক : আবদুল্লাহ বন্দর আল-ইতাইবি, কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স কলেজের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *