ইরান থেকে লেবানন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত ৪০ লাখ মানুষ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধে ইরানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যাটিকে প্রাথমিক হিসেবে ধরা হচ্ছে, কারণ কর্তৃপক্ষ এখনও প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করেনি।

যুদ্ধের এই ধ্বংসলীলা দেশটিতে ব্যাপক গণবাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর অনুমান অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের অভ্যন্তরে ইতোমধ্যে ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার তিন শতাংশেরও বেশি।

সংঘাতের ২৭তম দিনে এসে ত্রাণ সংস্থা এবং ইরানের সীমান্তবর্তী দেশগুলো একটি সম্ভাব্য শরণার্থী সংকটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, কারণ সাধারণ মানুষ সহিংসতা থেকে বাঁচতে পালাতে শুরু করেছে। খবর আলজাজিরার।

সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত এখন পর্যন্ত সীমিত এবং তা মূলত অর্থনৈতিক বা স্বল্পমেয়াদী। আফগানিস্তানে আগতদের অধিকাংশই হলো আফগান নাগরিক যারা নিরাপত্তাহীনতার কারণে বা বাধ্য হয়ে ইরান থেকে নিজ দেশে ফিরে আসছেন। পাকিস্তান কেবল অনুমোদিত নাগরিক বা ব্যবসায়ীদের প্রবেশের কথা জানিয়েছে, কোনো শরণার্থী আসার খবর দেয়নি। তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান এবং আজারবাইজান জানিয়েছে, তাদের সীমান্ত স্থিতিশীল রয়েছে এবং কেবল সীমিত আকারে অনুমোদিত পারাপার ও বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

ইরাক স্বল্প পরিসরে মানুষের ফিরে আসা এবং ৩২৫ জন ইরানি নাগরিকের সীমান্ত পার হওয়ার খবর দিয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরে মানুষ তাদের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দেশটিতে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল, পারমাণবিক স্থাপনা, শোধনাগার এবং লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্ট হামলার শিকার হয়েছে।

যাই হোক না কেন, ইরানের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২৮২টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ৬০০টি স্কুল এবং ৬৪ হাজার ৫৮৩টি ঘরবাড়িসহ অন্তত ৮৫ হাজার ১৭৬টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধুমাত্র তেহরানেই নগর প্রশাসন স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রায় ১৪ হাজার আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৬ হাজার মানুষকে মিউনিসিপ্যাল হোটেলে রাখা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মানুষের এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।

লেবাননে বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক মানুষ

যুদ্ধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে কেবল ইরান নয়, লেবাননেও চরম বাস্তুচ্যুতি সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের জন্য তাদের ‘বাধ্যতামূলক স্থানান্তর’ আদেশের পরিধি বাড়িয়েছে—যা এখন লিতানি নদী থেকে ও ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিমি উত্তরের জাহরানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মতে, ইসরায়েলের এই ব্যাপক উচ্ছেদ আদেশ এখন লেবাননের ১ হাজার ৪৭০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে, যা দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দেশটির ১০০টিরও বেশি শহর ও গ্রাম খালি করার নির্দেশ দিয়েছে।

ইসরায়েলি স্থল সেনারা এখন দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন অংশে তাদের দখলদারি বাড়িয়ে চলেছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সেখানে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করতে চায়। গত দুই সপ্তাহে লেবাননের প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে প্রায় একজন—অর্থাৎ জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত বাস্তুচ্যুত মানুষের মোট সংখ্যা ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৮ জনে পৌঁছেছে এবং এর মধ্যে ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৪২ জন সম্মিলিত আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বাস্তুচ্যুতির গতি দেশের আশ্রয় সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। অনেক পরিবার থাকার জায়গা না পেয়ে রাস্তা, যানবাহন বা খোলা জায়গায় রাত কাটাচ্ছে।

গত দুই সপ্তাহে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ লেবানন ছেড়েছেন, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দুই সপ্তাহের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এই বহির্গমনের একটি বড় অংশ প্রতিবেশী সিরিয়ার দিকে। ১৭ মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ সীমান্ত পার হয়েছেন, যাদের প্রায় অর্ধেকই শিশু। এদের অধিকাংশই সিরীয় নাগরিক, তবে পার হওয়াদের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার লেবানিজও রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *