সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলিনি, ফলাফল মেনে নিয়েছি : ডা. শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয়নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে, সেটা আমরা বলিনি। আমাদের অন্য কথা আছে। তবে আমরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছি। যাতে দেশ অচল না হয়ে পড়ে।

আজ সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নিজ বাড়িতে গ্রামবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এ কথা বলেন বিরোধী দলীয়নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

ডা. শফিকুর রহমান বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা যদি সঠিক ধারায় ফিরে না আসেন, মনে রাখবেন জুলাই মাত্র দুই বছর দেড় বছর আগে হয়েছে। সারা দেশের মানুষ জুলাই যোদ্ধা। এই মানুষগুলো আপনাদের ক্ষমা করবে না। আমরা চাই না আপনাদের পরিণতি অতীতের ফ্যাসিবাদীদের মতো হোক। তারা অন্যায় অপরাধ করেছিল, তাই তাদের পরিণতি এই হয়েছে। সেই আমলে আপনারাও নির্যাতিত ছিলেন, মজলুম ছিলেন, আমরাও ছিলাম। তা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন কেন? দীর্ঘদিনের জুলুম-বঞ্চনা উপভোগ করে যখন মুক্তির স্বাদ পেলেন, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছেন না কেন?

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ডা. শফিকুর রহমানের এই সফরকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দেয়। তাকে বরণ করতে শত শত নেতাকর্মী ভাটেরা ইউনিয়নের মুমিনছড়া চা বাগান এলাকায় জড়ো হন। সেখান থেকে মিছিল সহকারে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

শুভেচ্ছা বিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিলেট মহানগর আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও সিলেট মহানগরী নায়েবে আমির হাফেজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খান, কেন্দ্রীয় মজলিসের শুরা সদস্য ও সাবেক জেলা আমির মো. আব্দুল মান্নান, সিলেট মহানগর মজলিশে শুরা সদস্য আব্দুস সালাম আল মাদানী, জেলা নায়েবে আমির  মাওলানা আব্দুর রহমান,  জেলা  সেক্রেটারি মো. ইয়ামির আলী, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা  উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমেদ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইন, সাবেক জেলা সেক্রেটারি খন্দকার আব্দুস সোবহান ও আব্দুল হামিদ খান, উপজেলা  নায়েবে আমির জাকির আহমেদ, সেক্রেটারি বেলাল আহমদ চৌধুরী, উপজেলা শুরা সদস্য রাজানুর রহিম ইফতেখার, জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি মো. ফরিদ উদ্দিন, শহর সভাপতি কাজী দাইয়ান আহমেদসহ জামায়েত ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে সাধারণ দরিদ্র মানুষ—সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠনে অবদান রাখে। তাই এই অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার বা লুটতরাজ করার অধিকার কারো নেই। অতীতে সরকারে থাকাকালীন অনেকে চাঁদাবাজি ও লুটতরাজ চালিয়েছেন, যা মানুষ আর দেখতে চায় না।

জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার যেমন মালিক হন না, সরকারও তেমন জনগণের সম্পদের মালিক নয়। তারা কেবল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জনগণের জান-মাল ও ইজ্জতের হেফাজতকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সরকার যদি ম্যানেজারের ভূমিকা ভুলে গিয়ে নিজেদের মালিক ভাবতে শুরু করে, তবে দেশের মানুষ তা কখনোই বরদাশত করবে না।’

ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, জাতীয় সংসদ ভবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্থাপনা ও অর্থ জনগণের উপার্জনে তৈরি। তাই বিলাসিতা নয়, বরং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করাই হওয়া উচিত সরকারের একমাত্র লক্ষ্য।

ক্ষমতার মোহ বা ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়, বরং জনগণের আমানত রক্ষা এবং রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধনই আমাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতিতে সততা ও স্বচ্ছতার যে দৃষ্টান্ত আমরা স্থাপন করেছি, আগামী দিনেও তা অব্যাহত থাকবে।

নিজের জন্য ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা না নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই মাঠ বা সম্পদ যা-ই হোক, তা দেশের কাজে ব্যবহার করা হবে। বিদেশি মেহমান ও গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনার জন্য এটি ব্যবহৃত হবে। আমি এখানে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে থাকব না, এটি কেবল রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে ইনশাআল্লাহ।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলাম কোনো প্লট বা ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি গ্রহণ করব না। আমরা যা ঘোষণা দিয়েছি, কাজেও তার প্রতিফলন ঘটিয়েছি।’

চাঁদাবাজির সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজি করার জন্য সরকারে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না, বাইরে থেকেও তা সম্ভব। কিন্তু আপনারা সাক্ষী আছেন, আমাদের কোনো কর্মী, সহযোদ্ধা বা শুভাকাঙ্ক্ষী কখনোই এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জনমনে থাকা ক্ষোভের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অনেকে প্রশ্ন করেন যে ভোট দিলেন এক দলকে, অথচ সরকার গঠন করল অন্য দল। এই জালিয়াতির বিষয়টি কেবল আমরা নই, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মতো নিরপেক্ষ সংস্থাগুলোও স্পষ্টভাবে বলেছে।

দলীয় কর্মীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মানুষের মনে কষ্ট আছে, অনেকে প্রশ্ন করেন আর কত ধৈর্য ধরব? জীবন ও রক্ত দেওয়ার পর ধৈর্য এখন শেষ সীমায়। তবে আমরা বিশ্বাস করি, ইন্নাল্লাহা মা’আস সাবেরিন—নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।

একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা একটি বড় পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছি। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার ফিরে আসবে। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই দেশ পুনর্গঠন করতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *