বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নবনিযুক্ত উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে প্রথম কর্মদিবসে নিজ দপ্তরে যোগ দেন তিনি।
নবনিযুক্ত উপাচার্য প্রথম কর্মদিবসে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। প্রথম কর্মদিবসের শুরুতে উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকীকে তার কার্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সদ্য সাবেক উপাচার্যের (অস্থায়ী) পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় সদ্য সাবেক (অস্থায়ী) উপাচার্য ও উপউপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, প্রক্টর ডা. শেখ ফরহাদ, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, উপপরিচালক (জনসংযোগ) সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল আজম রঞ্জুসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, আজকের দিনটি আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানে আমি ইনটার্নশিপ করেছি। আরপি, হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন সুনাম আছে, তেমন নানাবিধ সমস্যাও আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা অনেক। সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে গণমানুষের সেই প্রত্যাশাকে পূরণ করতে হবে। সবাইকে একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, যে যে পদে চাকরি করেন সেই পদের কাজ ও দায়িত্ব কী কী সেটা উপলব্ধি করে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে মনোযোগী হতে হবে। যার যে দায়িত্ব সেটা সঠিকভাবে পালন করলেই বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে।
নবনিযুক্ত উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকীকে বিএমইউর জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষক, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এরপর নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, ডিন, কোর্স ডাইরেক্টর, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, মেডিক্যাল অফিসার এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় করেন। বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের সঙ্গে মতবিনিময়ে উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, চ্যালেঞ্জিং অবস্থার মধ্য থেকেই বিদ্যমান জনবলের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। প্রত্যেক মাসে বিভাগের কর্মকান্ডের অগ্রগতি ও মূল্যায়ন করতে হবে।
মেডিক্যাল অফিসারদের উদ্দেশে ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, রোগীদের চিকিৎসা সেবার শুরুর ভিত্তি হলো মেডিক্যাল অফিসাররা। মেডিক্যাল অফিসারদের চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে রোগীদের প্রতি চিকিৎসকদের মনোভাবের প্রতিফলন বহন করেন। ব্যক্তি জীবনে, কর্মস্থলে যত সমস্যা ও দুঃখ কষ্ট থাক না কেন রোগীদেরকে হাসিমুখে সেবা প্রদান করতে হবে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, চিকিৎসা শিক্ষা, সেবা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাকে এখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনার থেকে ভাইস-চ্যান্সেলর সবারই একটি ধ্যানে থাকতে হবে, তা হলো সঠিকভাবে প্রত্যেকের কাজটি যথাসময়ে পালন করা। শৃঙ্খলা বজায় রেখে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোগীসহ সবার সঙ্গে হাসিমুখে ভালো ব্যবহার করতে হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই একটি দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিগত কঠিন সময়ে দেশে যখন ন্যায়বিচার ছিল না, মেধার মূল্যায়ন ছিল না তখনও আমি নির্ভয়ে কথা বলেছি, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। আমি মহান আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাই না। আমার সাহসের মূল বিষয় হলো সততা। তাই আমি চাই, এখানে কর্মরত সবাই শৃঙ্খলার সঙ্গে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবে।
এ ছাড়া উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী প্রথম কর্মদিবসে বহির্বিভাগে রোগীদের সেবা কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে রাউন্ড দেন এবং কেবিন ব্লকে চিকিৎসাধীন সফলভাবে হওয়া কিডনি ট্রান্সপ্যান্টের এক রোগীর চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন।
গত ৯ মার্চ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সঞ্জীব দাশ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের সানুগ্রহ অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯৮ (২০২৫ সনের ১২ নং অধ্যাদেশ বলে সংশোধিত) এর ১২ ধারা অনুযায়ী অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকীকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হলো। উপাচার্য হিসেবে তাঁর নিযুক্তির মেয়াদ যোগদানের তারিখ হতে চার বছর হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী ১৯৮২ সালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরবর্তীতে সাবেক আইপিজিএমএআর থেকে ইনটার্নশিপ সম্পন্ন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি বিসিপিএস থেকে মেডিসিন বিষয়ে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চতর শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে ডা. এফ এম সিদ্দিকী ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যাসিট্যান্ট রেজিস্ট্রার এবং রেজিস্ট্রার অব মেডিসিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে কনসালট্যান্ট অব মেডিসিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সাবেক আপিজিএমআর বর্তমান বিএমইউতে রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান্স এবং মেডিসিন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইনস্টিটিউট অব এপিডেমাইলোজি, ডিজেসেস কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চে (আইইডিসিআর) মেডিসিন বিষয়ে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রফেসর অব মেডিসিন এবং কনসালটেন্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ডা. এফ এম সিদ্দিকী একজন সুদক্ষ সাংগঠনিক হিসেবে ২০০২-২০০৮ সালে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত ফেডারেশন অব মেডিক্যাল টিচার্স এ্যাসোসিয়েশনের জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে তিনি ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন জেনারেল হাসপাতালে কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকীর মেডিক্যাল শিক্ষার ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষায় তাঁর রয়েছে বৈচিত্র্যময় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তিনি এফসিপিএস এবং এমডি প্রশিক্ষাণার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদানে একজন স্বনামধন্য গুণী শিক্ষক হিসেবে অবদান রেখেছেন। তিনি দীর্ঘদিন মেন্টর হিসেবে ক্লিনিক্যাল বিচার-বিবেচনা, নৈতিক চর্চাসহ বাংলাদেশের চিকিৎসকদের একাডেমিক উন্নয়ন বিরাট অবদান রেখেছেন। সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ জার্নালের চিফ এডিটর এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল জার্নালের অ্যাসিট্যান্ট এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে ডা. এফ এম সিদ্দিকী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত শতাধিক গবেষণা প্রকাশনার লেখক। তিনি জাতীয় ক্লিনিক্যাল ও জনস্বাস্থ্য গাইড লাইন তৈরিতেও বিশেষ অবদান রেখেছেন। এ ছাড়া ইন্টারন্যাল মেডিসিন, পালমোলজি বা শ্বাসতন্ত্র বিষয়ক চিকিৎসায় বিশেষ অবদান রাখার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অবদান রাখা এবং এ বিষয়ে আরও কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাঁর রয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন এবং আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের নিবিড় সম্পর্ক। বর্তমানে তিনি ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা, একাডেমিক শিক্ষাদান, গবেষণা পরামর্শ ও মেন্টরশিপে সক্রিয় অবদান রেখে চলছেন।