বাব আল-মান্দেব বন্ধের হুমকি, বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে?

হরমুজ প্রণালির পর এবার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘বাব আল-মান্দেব’ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির শীর্ষ উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়তি জানিয়েছেন, তেহরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে, একইভাবে তাদের মিত্ররা চাইলে বাব আল-মান্দেব নৌপথটিও অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। প্রভাবশালী এই কূটনীতিকের এমন বার্তায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে চরম অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইরানের এই কঠোর অবস্থান মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক হুমকির পাল্টা জবাব। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে রাজি না হয়, তবে চলতি সপ্তাহের বুধবার (৮ এপ্রিল) থেকেই ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোতে বোমা হামলা চালানো হবে।

এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছাড়া অন্য যেসব দেশ আলোচনার মাধ্যমে যাতায়াত করতে চাইবে, তাদের জন্য হরমুজ খোলা থাকবে। তবে ওয়াশিংটন যদি কোনো ‘নির্বোধ ভুল’ করে, তবে ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ (মিত্র গোষ্ঠীসমূহ) বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ এক নিমেষেই থামিয়ে দেবে।

কেন এই নৌপথটি বিশ্বের জন্য অপরিহার্য?

লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি বৈশ্বিক তেল ও পণ্য বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির জন্য এখন লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আরামকোরিএক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে দেশটি বর্তমানে দৈনিক রেকর্ড ৭০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে সরবরাহ করছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। যদি হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব উভয় পথই বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২৫ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ পুরোপুরি আটকে যাবে।

ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর একটি কেন্দ্রীয় অংশ, তারা ইতোমধ্যেই এই পথটি অবরোধ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। গাজা যুদ্ধ চলাকালীন তারা লোহিত সাগরে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বাণিজ্য স্থবির করে দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই; এই পথে আসা মাত্র কয়েকটি জাহাজে হামলা চালালেই বিমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করবে, যা কার্যত পুরো লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক চলাচল পঙ্গু করে দেবে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেন্ডাল এই অবস্থাকে একটি ‘দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার বাণিজ্য এই পথের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে কারখানা, রান্নাঘর থেকে শুরু করে পেট্রোল স্টেশন পর্যন্ত সবখানে তীব্র অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও পণ্যসংকট দেখা দেবে। বর্তমানে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *