নারীর অদৃশ্য শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে : ফারজানা শারমীন

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেছেন, গৃহস্থালি কাজে নারীরা যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, তা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এতদিন তা অস্বীকৃত ছিল। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নারীর এই অদৃশ্য শ্রমের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি দিতে কাজ শুরু করেছে।’

রোববার (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা জানান।

আজ বিকেলে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাক্ষাৎকালে প্রতিমন্ত্রী নারী দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচি, মন্ত্রণালয়ের নতুন ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’, গৃহ শ্রমের জিডিপি স্বীকৃতি এবং নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

নারীদের গৃহ শ্রমের মূল্যায়ন ও জিডিপির অবদান প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, ‘গৃহিণীরা সারাদিন ঘরে যে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, তার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি সাধারণত হয় না।’

প্রতিমন্ত্রী এই মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘প্যাসিভ ওয়েতে যারা ঘরে কাজ করছেন, তারা আমাদের জিডিপিতে প্রায় ১৮ শতাংশ অবদান রাখছেন। এই নারীরা ঘরে কাজ না করলে আমরা বাইরে কাজ করতে পারতাম না। ফ্যামিলি কার্ডের মূল দর্শন হলো এই অদৃশ্য শ্রমকে সম্মান জানানো। এটি তাদের শ্রমের প্রতি রাষ্ট্রের একটি ক্ষুদ্র সম্মাননা বা এপ্রিসিয়েশন।’

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আগামীকাল রোববার আন্তর্জাতিক নারী দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা জানান। তিনি বলেন, এবার আমরা গণতন্ত্রের লড়াইয়ে অকুতোভয় ভূমিকা এবং নারী নেতৃত্বে অদম্য সাহসের প্রতীক হিসেবে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘অদম্য নারী’ সম্মানে ভূষিত করছি।

মন্ত্রণালয়ের নতুন মাইলফলক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন আরও বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম একটি ইউনিভার্সাল প্রজেক্ট, যা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীর নামে ইস্যু করা হচ্ছে।’

‘পরিবার’কে উন্নয়নের একক হিসেবে ঘোষণা করে ফারজানা শারমীন বলেন, বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যক্তিকে নয়, বরং পরিবারকে বেছে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, একটি পরিবার স্বাবলম্বী হলে রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে। সেই লক্ষ্যেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পটি ডিজাইন করা হয়েছে।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ১০ মার্চ এ কর্মসূচি উদ্বোধনের পর প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাঠানো শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, আইন থাকলেও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা ও ভিকটিমকে বারবার ভিকটিমাইজ করার কারণে বিচারকাজ ব্যাহত হয়।

ফারজানা শারমীন বলেন, আমরা পলিসি লেভেলে কাজ করছি যাতে ভিকটিমের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারে। সেফ হোমগুলোকে নামমাত্র নয়, সত্যিকার অর্থেই নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করার কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারী ও মেয়ে শিশুদের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন না। তিনি তাদের ‘বিশেষভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু’ হিসেবে অভিহিত করেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখেছি, উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো থাকলেও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি আছে।

ফারজানা শারমীন আরও বলেন, আমার লক্ষ্য হলো সংখ্যা না বাড়িয়ে গুণগত মান নিশ্চিত করা। আমি ১০টা সেফ হোম বা স্কুল করার চেয়ে তিনটি উন্নত মানের সেন্টার করতে চাই, যা সত্যিকার অর্থে তাদের জীবন বদলে দেবে।

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নারীদের তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইনফরমেশন ইজ মানি। আমরা আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোলাবরেশনের মাধ্যমে নারীদের আইসিটি ফ্রেন্ডলি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তবে আমরা কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটির ওপর জোর দিচ্ছি। কয়েকশ অদক্ষ কর্মী তৈরির চেয়ে পাঁচটি স্বাবলম্বী পরিবার তৈরি করা আমাদের লক্ষ্য।

শিক্ষায় নারীর অগ্রগতির প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে আমরা শিক্ষার যে পাসের হার দেখেছি, তা ছিল মূলত ‘শো-অফ’। প্রকৃত মেধার উন্নয়ন না হওয়ায় উচ্চশিক্ষায় গিয়ে মেয়েরা ঝরে পড়ছে। আমরা এখন কোয়ান্টিটির বদলে কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

সাক্ষাৎকারের শেষে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন আগামীকাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের নারী সমাজের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, নারী জাগরণের মূল ভিত্তি হতে হবে আত্ম-উপলব্ধি। আপনি যে অবস্থানেই থাকুন—দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত, নিজের ভেতরের শক্তিকে বিশ্বাস করুন। আমাদের স্লোগানই হলো—‌‘তুমি চাইলে তুমিই পারো’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *