কিশোরগঞ্জের তারাইল উপজেলার তেওরিয়া গ্রামের দিনমজুর মো. তারু খানের মেয়ে সোনিয়া ধলা বহুমুখী আলিম মাদ্রাসার দাখিল শাখার ২০২৫–২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নবম শ্রেণির ছাত্রী। তার মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা—এটি কি হত্যা, না কি আত্মহত্যা?
সরেজমিন অনুসন্ধানে এলাকাবাসী ও প্রতিবেশীরা জানান, সোনিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি রহস্যজনক। তাদের দাবি, সোনিয়াকে হত্যা করে আত্মহত্যা হিসেবে ঘটনাটি ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
সোনিয়ার বাবা মো. তারু খান জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, বুধবার আনুমানিক দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে তার মেয়েকে হত্যা করা হয়। পরে প্রধান আসামি আজিম খানসহ তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে সোনিয়ার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঘরের ভেতরে ঝুলিয়ে রেখে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর আজিম খান তাকে মোবাইলে ফোন করে বলেন, “তোমার মেয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে।” পরে আজিম খানের মা রিতা বেগম ফোন করে জানান, সোনিয়া নাকি “স্টক” করেছে। একেকজনের একেক রকম কথা শুনে তিনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
সোনিয়ার বাবার অভিযোগ, তিন নম্বর আসামি সোহেল খানের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য গত তিন বছর ধরে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সোনিয়ার বয়স কম হওয়ায় তিনি বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে আসামিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রায় দুই মাস আগে আবারও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে সেটিও নাকচ করা হয়। তার ধারণা, সেই ক্ষোভ থেকেই তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পর তারাইল থানায় মামলা করতে গেলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তাকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখে একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে বলা হয়—“আপনার মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে।”
সোনিয়ার বাবা আরও বলেন, “আমি গিয়ে দেখি আমার মেয়ের গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় বারান্দার বর্গার সঙ্গে ঝুলে আছে, কিন্তু তার পা মাটিতে লেগে ছিল। তাহলে সে কীভাবে ফাঁস দিল?”
ঘটনার সময় চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দা সাদিয়া ও রাপালী ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, দুই নম্বর আসামি জুয়েল খান ও তিন নম্বর আসামি সোহেল খান দ্রুত লাশ নামিয়ে ঘরের ভেতরে খাটের ওপর শুইয়ে রাখছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, পুলিশ আসার আগেই আসামিরা নিজেরাই লাশ নামিয়ে দ্রুত থানায় নিয়ে যায়। এ সময়ের একটি ভিডিও ফুটেজেও সোনিয়ার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে বলে জানা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী এক বৃদ্ধা নারীও দাবি করেছেন, সোনিয়ার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল।
সোনিয়ার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সাদিয়া ও রুপা বলেন, “যদি আত্মহত্যা হতো, তাহলে হাত ভাঙা থাকবে কেন? শরীরে আঘাতের চিহ্নই বা থাকবে কেন?”
তবে তারাইল থানা পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলেই উল্লেখ করেছে।
এদিকে থানায় মামলা গ্রহণ না করায় সোনিয়ার বাবা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে আজিম খানসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও দুই থেকে তিনজন অজ্ঞাতনামা আসামি রাখা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের পরও তদন্তে তেমন অগ্রগতি হয়নি। এদিকে প্রধান আসামি আজিম খান বিদেশে পালিয়ে গেছেন।
এ বিষয়ে তারাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোহাইমেনুল ইসলাম জানান, “সম্ভবত আগে থেকেই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেওয়া ছিল, তাই সে বিদেশে যেতে পেরেছে।”
এদিকে আসামিরা পলাতক থাকলেও বাদীপক্ষকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তারাইল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, সোনিয়ার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেন ভবিষ্যতে আর কোনো সোনিয়ার জীবনে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি নেমে না আসে—এটাই তাদের প্রত্যাশ
এসএন/পিডিকে