ট্রাম্পের অশালীন হুমকির জবাব উপহাস-বিদ্রূপে দিল ইরানের দূতাবাসগুলো

গত ৫ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে গালিগালাজ করে হুমকি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দাও, নইলে তোমাদের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা ফেলা হবে। হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। খবর আলজাজিরার।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ অ্যাকাউন্টে এবং পরবর্তীতে এক্সে গালিগালাজ উল্লেখ করে এক পোস্টে লেখেন, ইরানে মঙ্গলবার একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র দিবস ও সেতু দিবস পালিত হবে। যা হবে, কখনোই তার মতো আর কিছু হবে না!!! প্রণালিটা খুলে দাও, তোমরা আস্ত উন্মাদ, নইলে তোমাদের নরকে বাস করতে হবে–শুধু দেখো!

এর আগে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে রাজি না হলে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর কয়েকদিন পরই তিনি এবার নতুন করে অশালীন ভাষায় হুমকি দিলেন।

অন্যদিকে, ইরান ট্রাম্পের এসব অসার উক্তির পাল্টা জবাব দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, বরং দেশটি তার হুমকিগুলোকে “বোকামিপূর্ণ” আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। অপরদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ইরানি দূতাবাসগুলো হুমকির জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রসিকতার ছলে ট্রাম্পকে বিদ্রূপ করেছে।

ইরানের দূতাবাসগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় 

লন্ডন থেকে শুরু করে প্রিটোরিয়া এবং নয়াদিল্লি থেকে মস্কো পর্যন্ত ইরানের দূতাবাসগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের মানসিকতার কঠোর সমালোচনা এবং তার ভাষার উপহাস ও বিদ্রূপাত্মক মিম শেয়ার করে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা করেছে।

ট্রাম্পের ‘(হরমুজ) প্রণালিটি খুলে দাও’—এই সরাসরি দাবিকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে। জিম্বাবুয়েতে থাকা ইরানি দূতাবাস এক্স পোস্টে বলে, ‘আমরা চাবি হারিয়ে ফেলেছি।’

ট্রাম্পের হুমকির জবাবে করা এমন রসিকতা দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাসও জিম্বাবুয়েতে থাকা দূতাবাসের কথার সূত্র ধরে বলে, ‘চুপ… চাবিটা ফুলের টবের নিচে আছে। শুধু বন্ধুদের জন্য খুলো।’

বিদ্রূপকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে বুলগেরিয়ায় থাকা ইরানি দূতাবাস প্রয়াত সাজাপ্রাপ্ত শিশু যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পের হুমকির কড়া কটাক্ষ করে বলেছে, ‘বন্ধুদের জন্য দরজা খোলা। কিন্তু এপস্টেইনের বন্ধুদের জন্য চাবি দরকার হবে।’

মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী

ইরানি দূতাবাসগুলোর অনলাইনে দেওয়া জবাবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে ৭৯ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মানসিকভাবে অসুস্থ ও ভারসাম্যহীন হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা ইরানি দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদেরকে সংবিধানের ‘২৫তম সংশোধনীর ৪নং ধারা নিয়ে গুরুত্বসহ বিবেচনা করার’ আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন সংবিধানের এ ধারায় পদের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হলে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে অপসারণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা দূতাবাসটি তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে ব্রিটিশ সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব পিয়ার্স মরগ্যানের একটি পোস্ট শেয়ার করে। মরগ্যান ট্রাম্পের টুইটটিকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের ‘মাথা খারাপ’ হয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ইরানি দূতাবাস আরও বলেছে, ‘মানবতাকে অবশ্যই জানতে হবে কোন ধরনের প্রাণী মার্কিন জনগণকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।’

ট্রাম্পের মানসিক অবস্থার বিষয়টি আবারও তুলে ধরেছে তাজিকিস্তানে থাকা ইরানি দূতাবাস। তারাও পিয়ার্স মরগ্যানের একই পোস্টটি শেয়ার করে ক্যাপশনে যোগ বলেছে, ‘বিষয়টি কিছুটা দেরিতে বোঝা গেল, তবুও অভিনন্দন। আপনাদের সবার মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ।’

লন্ডনের ইরানি দূতাবাস একটু সাহিত্যিক পন্থা অবলম্বন করে। তারা একজন উন্মাদ ব্যক্তির হাতে তলোয়ার তুলে দেওয়ার বিপদ সম্পর্কে রুমির একটি ফারসি কবিতা জুড়ে দেয় এবং এর সঙ্গে মার্ক টোয়েনের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করে। দূতাবাসটির এক্স অ্যাকাউন্টে ট্রাম্পের উদ্দেশে লেখে, ‘মুখ খুলে সমস্ত সন্দেহ দূর করার চেয়ে, মুখ বন্ধ রাখো যেন লোকে তোমাকে বোকা ভাবে, বরং সেটাই শ্রেয়।’ এই কথা দিয়ে দূতাবাসটি মূলত ট্রাম্পকে উন্মাদ হিসেবে পরিচিত না হতে মুখ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়। 

‘১৮+’ সতর্কবার্তা

বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন ট্রাম্পের অশালীন ভাষা ও ধর্মীয় প্রসঙ্গ ব্যবহারের সমালোচনা করেছে। ভারতে থাকা ইরানি দূতাবাসও পিছিয়ে নেই। দূতাবাসটি তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে লেখে, ‘হেরে যাওয়া বদমেজাজি ছেলে-মেয়েরা গালাগাল আর অপমান করার পথ বেছে নেয়। নিজেকে সামলাও, বুড়ো!’

অস্ট্রিয়ায় থাকা ইরানি দূতাবাস ট্রাম্পের হুমকির পোস্টের স্ক্রিনশটের ওপর বিশাল আকারের ‘১৮+’ লেখা বসিয়ে দিয়েছে। ভিয়েনার ইরানি মিশন লিখেছে, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট নজিরবিহীন ভিক্ষাবৃত্তির পর্যায়ে নেমে এসেছেন, তিনি এখন তিক্ত, অন্তঃসারশূন্য, অভদ্র ও হুমকিতে আবদ্ধ।’

দূতাবাসটি আরও উল্লেখ করে, ‘আরও একটি সতর্কবার্তা : ১৮ বছরের কম বয়সী সবাইকে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর থেকে দূরে রাখুন। একইস সঙ্গে ওয়াশিংটনকে সংযতভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ।’

রাজনৈতিক কার্টুন

রাশিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলোতে থাকা ইরানি দূতাবাসগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপর ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে কার্টুন প্রকাশ করে হুমকির দেয়।

বার্লিনে থাকা ইরানি দূতাবাস জার্মান পত্রিকা ডের স্পিগেলে প্রকাশিত একটি ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে ট্রাম্পকে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সম্রাট হিসেবে কল্পনা করতে দেখা যায়।

মস্কোর ইরানি দূতাবাস একটি ছবি প্রকাশ করেছে, যেখানে ট্রাম্পকে বিভ্রমে থাকা ডন কুইক্সোট হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি ঘোড়ায় চড়ে একটি উইন্ডমিলের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন এবং তার এক সঙ্গী চিৎকার করে বলছে—‘বস, এটা তো শুধু একটা উইন্ডমিল!’ ডন কুইক্সোট হলেন সপ্তদশ শতাব্দীর একটি স্প্যানিশ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র, যিনি নিজের সম্পর্কে মহত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণার জন্য উপহাসের পাত্র হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *